আন নিসা, আয়াত ৭৬-৯১

পৃষ্ঠা নং-২৬৯

হযরত হাসান, কাতাদা ও ইবনে আবী লায়লা (র‘হিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখের মতে দায়িত্বশীল লোক বলতে ওলামা ও ফকীহগণকে বোঝায়। হযরত সুদ্দী (রহঃ) বলেন যে, এর দ্বারা শাসনকর্তা ও কর্তৃপক্ষকে বোঝায়। আল্লামা আবূ বকর জাসসাস এতদুভয় মত উদ্ধৃত করার পর বলেছেন, সঠিক ব্যাপার হলো এই যে, এতদুভয় অর্থই ঠিক। কারণ, ‘উলুল-আমর’ শব্দটি উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অবশ্য এতে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন যে, ‘উলুল-আমর’ বলতে ফকীহগণকে বোঝানো যেতে পারে না। তার কারণ, أُولِوا الْأَمْرِ (উলুল-আমর) শব্দটি তার শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে সে সমস্ত লোককে বোঝায়, যাদের হুকুম বা নির্দেশ চলতে পারে। বলাবাহুল্য, এ কাজটি ফকীহ্‌গণের নয়। প্রকৃত বিষয় হল এই যে, হুকুম চলার দু’টি প্রেক্ষিত রয়েছে। (এক) জবরদস্তিমূলক। এটা শুধুমাত্র শাসকগোষ্ঠী বা সরকার দ্বারাই সম্ভব হতে পারে। (দুই) বিশ্বাস ও আস্থার দরুন হুকুম মান্য করা। আর সেটা ফকীহগণই অর্জন করতে পেরেছিলেন এবং যা সর্বযুগের মুসলমানদের অবস্থার দ্বারা প্রতিভাত হয়। ধর্মীয় ব্যাপারে সাধারণ মুসলমানগণ নিজের ইচ্ছা ও মতামতের তুলনায় আলেম সম্প্রদায়ের নির্দেশকে অবশ্য পালনীয় বলে সাব্যস্ত করে থাকে। তাছাড়া শরীয়তের দৃষ্টিতেও সাধারণ মানুষের জন্য আলেমদের হুকুম মান্য করা ওয়াজিবও বটে। সুতরাং তাঁদের ক্ষেত্রেও ‘উলুল আমর’-এর প্রয়োগ যথার্থ হবে। -(আহকামুল কুরআন, জাসসাস)।

আধুনিক সমস্যাবলী সম্পর্কিত বিষয়ে কেয়াস ও ইজতেহাদঃ এ আয়াতের দ্বারা একথাও বোঝা যাচ্ছে যে, যেসব বিষয়ে কোন ‘নস’ তথা কুরআন-হাদীসের সরাসরি কোন বিধান নেই, সেগুলোর হুকুম ‘ইজতেহাদ’ ও কেয়াসের রীতি অনুযায়ী কুরআনের আয়াত থেকে উদ্ভাবন করতে হবে। তার কারণ, এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আধুনিক কোন বিষয়ের সমাধানকল্পে রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বর্তমানে তাঁর নিকট যাও। আর যদি তিনি বর্তমান না থাকেন, তাহলে ফকীহগণের নিকট যাও। কারণ, তাঁদের মধ্যেই বিধান উদ্ভাবন করার মত পরিপূর্ণ যোগ্যতা বিদ্যমান রয়েছে।

এই বর্ণনার দ্বারা কতিপয় বিষয় প্রতীয়মান হয়। যথা ‘নস’ বা কুরআন-হাদীসের সরাসরি নির্দেশের অবর্তমানে ওলামাদের কাছে যেতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ্‌র নির্দেশ দু’রকম। কিছু হল সরাসরি ‘নস’ বা কুরআন-সুন্নাহ্‌ভিত্তিক এবং কিছু হল পরোক্ষ ও অস্পষ্ট, যা আল্লাহ্ তাআলা আয়াতসমূহের গভীরে নিহিত রেখেছেন।

তৃতীয়তঃ এ ধরনের অন্তর্নিহিত মর্মগুলো কেয়াস ও ইজতেহাদের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা আলেম সম্প্রদায়ের একান্ত দায়িত্ব।

চতুর্থতঃ এসব বিধানের ক্ষেত্রে আলেম সম্প্রদায়ের অনুসরণ করা সাধারণ মানুষের অবশ্য কর্তব্য। -(আহকামুল-কুরআন, জাসসাস)

রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও প্রমাণ উদ্ভাবন সংক্রান্ত নির্দেশের আওতাভুক্তঃ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে হুকুম-আহকাম উদ্ভাবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তার কারণ, আয়াতে দু’রকম লোকের নিকট প্রত্যাবর্তন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন রসূলে-আকরাম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং অপরজন হলেন ‘উলুল-আমর’। অতঃপর বলা হয়েছে لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ –আর এই নির্দেশটি হল ব্যাপক। এতে উল্লেখিত দু’রকম লোকের মধ্যে কাকেও নির্দিষ্ট করা হয়নি। অতএব, এতে প্রমাণিত হয় যে, হুযূর (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও আহ্‌কাম উদ্ভাবন-সংক্রান্ত নির্দেশের আওতাভুক্ত।– (আহ্‌কামুল-কুরআন, জাসসাস)

কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ (১) কারো মনে যদি এমন কোন সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে, এ আয়াতের দ্বারা শুধুমাত্র এতটুকুই বোঝা যায় যে, শত্রুর ভয়-শঙ্কা সম্পর্কে তোমরা নিজে নিজে কোন রটনা করো না, বরং যারা জ্ঞানী ব্যক্তি এবং যারা সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় তাদের সাথে যোগাযোগ কর। তারা চিন্তা-ভাবনা করে যা করতে বলবেন তোমরা সে মতই কাজ করবে। বলাবাহুল্য, দুর্যোগ সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই।

তাহলে তার উত্তর এই যে, وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ বাক্যে শত্রুর কোন উল্লেখ নেই। কাজেই এ নির্দেশ ভয় ও শাস্তি উভয় অবস্থাতেই ব্যাপক। এ নির্দেশের সম্পর্ক যেমন শত্রুর সাথে, তেমনিভাবে দুর্যোগ সংক্রান্ত সমস্যার সাথেও বটে। কারণ, যখন কোন নতুন বিষয় বা মাসআলা সাধারণ মানুষের সামনে উদ্ভব হয়, যার হালাল হওয়া কিংবা হারাম হওয়ার ব্যাপারে সরাসরি কুরআন বা হাদীসের কোন নির্দেশ নেই, তখন তারা বিরাট দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। তারা বুঝে উঠতে পারে না, কোন দিকটি তারা গ্রহণ করবে। অথচ উভয় দিকেই লাভ-ক্ষতি উভয় সম্ভাবনাই রয়েছে। এমন অবস্থায় শরীয়ত সবচেয়ে উত্তম পথ বাতলে দিয়েছে। তাহল উদ্ভাবন إستنباط কর। উদ্ভাবনের মাধ্যমে যা পাওয়া যায়, তারই উপর আমল করবে। -(আহকামুল-কুরআন, জাসসাস)

ইজতেহাদ ও এস্তেম্বাত বলিষ্ঠ ধারণা সৃষ্টি করে, নিশ্চিত বিশ্বাস নয়ঃ (২) এস্তেম্বাত এর মাধ্যমে আলেমগণ যে নির্দেশ উদ্ভাবন করবেন, সে সম্পর্কে নিশ্চিত ও অকাট্যভাবে একথা বলা যাবে না যে, আল্লাহ্ তাআলার নিকটও এটাই নিশ্চিতভাবে সত্য ও সঠিক। বরং এই নির্দেশ বা বিধানটি সম্পূর্ণভাবে অভ্রান্ত নাও হতে পারে। তবে তা সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে থাকে, যা আমল করার জন্য যথেষ্ট।– (আহকামুল-কুরআন, জাসসাস)

কুরআনী বিধানের বর্ণনাশৈলীঃ فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ – এ আয়াতের প্রথম বাক্যে রসূলে কারীম (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, “আপনি একাই যুদ্ধের জন্যে তৈরী হয়ে পড়ন; কেউ আপনার সাথে থাক বা নাই থাক।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বাক্যে একথাও বলা হয়েছে যে, অন্যান্য মুসলমানদেরকে এ ব্যাপারে উৎসাহদানের কাজটিও পরিহার করবেন না। এভাবে উৎসাহদানের পরেও যদি তারা যুদ্ধের জন্য উদ্‌বুদ্ধ না হয়, তবে আপনার দায়িত্ব পালিত হয়ে গেল; তাদের কর্মের জন্য আপনাকে জবাবদেহী করতে হবে না।

এতদসঙ্গে একা যুদ্ধ করতে গিয়ে যেসব বিপদাশঙ্কা দেখা দিতে পারে, তার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে- “আশা করা যায় আল্লাহ্ কাফেরদের যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন এবং তাদেরকে ভীত ও পরাজিত করে দেবেন। আর আপনাকে একাই জয়ী করবেন।” অতঃপর এই বিজয় প্রসঙ্গে প্রমাণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, আপনার প্রতি যখন আল্লাহ্ তাআলার সমর্থন রয়েছে, যার সমরশক্তি কাফেরদের শক্তি অপেক্ষা অসংখ্যগুণ বেশী, তখন আপনার বিজয়ই অবশ্যম্ভাবী ও নিশ্চিত। তারপর এই সুদৃঢ় প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে স্বীয় শাস্তির কঠোরতা বর্ণনা করা হয়েছে। এ –

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ