আন নিসা, আয়াত ৭৬-৯১

পৃষ্ঠা নং-২৭১

বারীরা ভালবাসায় পাগলপারা হয়ে পড়লে রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুগীছকে পুনরায় বিবাহ করার জন্য বারীরার কাছে সুপারিশ করেন। বারীরা আরয করলেনঃ ইয়া রসূলুল্লাহ্! এটি আপনার নির্দেশ হলে শিরোধার্য, পক্ষান্তরে সুপারিশ হলে আমার মন তাতে সম্মত নয়। রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ নির্দেশ নয়, সুপারিশই। বারীরা জানতেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নীতির বাইরে অসন্তুষ্ট হবেন না। তাই পরিষ্কার ভাষায় আরয করলেনঃ তাহলে আমি এ সুপারিশ গ্রহণ করব না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হৃষ্টচিত্তে তাকে তদবস্থায়ই থাকতে দিলেন।

এ ছিল সুপারিশের স্বরূপ। শরীয়তের দৃষ্টিকোণে এ জাতীয় সুপারিশ দ্বারাই সওয়াব পাওয়া যায়। আজকাল বিকৃত আকারে যে সুপারিশ মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, তা প্রকৃতপক্ষে সুপারিশ নয়; বরং এ হচ্ছে সম্পর্ক ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা। এ কারণেই আজকাল সুপারিশ গ্রহণ করা না হলে সুপারিশকারী অসন্তুষ্ট হয়ে যায়; বরং শত্রুতা সাধনে উদ্যত হয়। অথচ বিবেক ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে চাপ সৃষ্টি করা জবরদস্তির অন্তর্ভুক্ত এবং কঠোর গোনাহ। এটি কারও অর্থ সম্পদ কিংবা কারও অধিকার জবরদস্তি করায়ত্ত করে নেয়ার মতই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শরীয়ত ও আইনের দৃষ্টিতে স্বাধীন ছিল। আপনি জোর-জবরদস্তি করে তার স্বাধীনতা হরণ করেন। সুতরাং এ হচ্ছে একজনের অভাব দূর করার জন্য অন্যের ধন-সম্পদ চুরি করে বিলিয়ে দেয়ার অনুরূপ। সুপারিশের বিনিময় গ্রহণ করা ঘুষ। হাদীসে একে سحت বা হারাম বলা হয়েছে। আর্থিক ঘুষ হোক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শ্রমের বিনিময়ে নিজের কোন কাজ হাসিল করা হোক- সর্বপ্রকার ঘুষই এর অন্তর্ভুক্ত।

কাশ্‌শাফ প্রভৃতি গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ ঐ সুপারিশ ভাল, যার উদ্দেশ্য কোন মুসলমানের অধিকার পূর্ণ করা অথবা তার কোন বৈধ উপকার করা অথবা ক্ষতির কবল থেকে তাকে রক্ষা করা হয়ে থাকে। এছাড়া এ সুপারিশটিও কোন জাগতিক লাভালাভ অর্জনের জন্যে না হওয়া চাই; বরং আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে দুর্বলের সমর্থনের লক্ষ্যে হওয়া উচিত এবং সুপারিশ করে কোন আর্থিক অথবা কায়িক ঘুষ না নেয়া চাই। এ সুপারিশ কোন অবৈধ কাজে না হওয়া চাই এবং যে অপরাধের শাস্তি কুরআনে নির্ধারিত রয়েছে, এরূপ কোন অপরাধ মাফ করাবার জন্যেও না হওয়া চাই।

বাহরে মুহীত, মাযহারী প্রভৃতি গ্রন্থে বলা হয়েছেঃ কোন মুসলমানের অভাব-অনটন দূর করার জন্যে আল্লাহ্‌র কাছে দুআ করাও ভাল সুপারিশের অন্তর্ভুক্ত। এতে দুআকারীও সওয়াব পায়। এক হাদীসে আছে, যখন কেউ মুসলমান ভাইয়ের জন্যে নেক দুআ করে, তখন ফেরেশতা বলেনঃ ولك يمثل অর্থাৎ, আল্লাহ্ তাআলা তোমারও অভাব দূর করুন।

সালাম ও ইসলামঃ وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا এ আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা সালাম ও তার জওয়াবের আদব বর্ণনা করেছেন।

تَحِيَّة-এর تَحِيَّة শব্দের ব্যাখ্যা ও এর ঐতিহাসিক পটভূমিঃ শাব্দিক অর্থ حياك الله (আল্লাহ্ তোমাকে জীবিত রাখুন) বলা। ইসলামপূর্ব কালে আরবরা পরস্পরের সাক্ষাৎকালে একে অন্যকে حياك الله কিংবা أنعم الله بك عينا কিংবা أنعم صباحاً ইত্যাদি সম্ভাষণে সালাম করতেন। ইসলাম এ সালাম পদ্ধতি পরিবর্তন করে السلام عليكم বলার রীতি প্রচলিত করেছে। এর অর্থ, তুমি সর্বপ্রকার কষ্ট ও বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাক।

ইবনে-আরাবী আহকামূল-কুরআন গ্রন্থে বলেনঃ ‘সালাম’ শব্দটি আল্লাহ্ তাআলার উত্তম নামসমূহের অন্যতম। السلام عليكم –এর অর্থ এই যে, رقيبٌ عليكم অর্থাৎ, আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের সংরক্ষক।

ইসলামী সালাম অন্যান্য জাতির সালাম থেকে উত্তমঃ  জগতের প্রত্যেক সভ্য জাতির মধ্যে পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের সময় ভালবাসা ও সম্প্রীতি প্রকাশার্থে কোন না কোন বাক্য আদান-প্রদান করার প্রথা প্রচলিত আছে। কিন্তু তুলনা করলে দেখা যাবে যে, ইসলামী সালাম যতটুকু ব্যাপক অর্থবোধক, অন্য কোন সালাম ততটুকু নয়। কেননা, এতে শুধু ভালবাসায় প্রকাশ করা হয় না, বরং সাথে সাথে ভালবাসার যথার্থ হকও আদায় করা হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌র কাছে দুআ করা হয় যে, আল্লাহ্ আপনাকে সর্ববিধ বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রাখুন। এ দুআটি আরবদের প্রথা অনুযায়ী শুধু জীবিত থাকার দুআ নয়; বরং পবিত্র জীবনের দুআ। অর্থাৎ, সর্ববিধ বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকার দুআ। এতে এ বিষয়েরও অভিব্যক্তি রয়েছে যে, আমরা ও তোমরা- সবাই আল্লাহ্ তাআলার মুখাপেক্ষী। তাঁর অনুমতি ছাড়া আমরা একে অপরের উপকার করতে পারি না। এ অর্থের দিক দিয়ে বাক্যটি একাধারে একটি ইবাদত এবং মুসলমান ভাইকে আল্লাহ্‌র কথা মনে করিয়ে দেয়ার উপায়ও বটে।

ইবনে আরাবী আহ্‌কামূল-কুরআন গ্রন্থে ইমাম ইবনে উয়াইনার এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ

أتدرى مالسلام يقول أنت آمن منى- অর্থাৎ, সালাম কি বস্তু, তুমি জান? সালামকারী ব্যক্তি বলে যে, তুমি আমার পক্ষ থেকে বিপদমুক্ত।

মোটকথা এই যে, ইসলামী সালামে বিরাট অর্থগত ব্যাপ্তি রয়েছে। যথা,

(১) এতে রয়েছে আল্লাহ্ তাআলার যিক্‌র, (২) আল্লাহ্‌র  কথা মনে করিয়ে দেয়া, (৩) মুসলমান ভাইয়ের প্রতি ভালবাসা ও সম্প্রীতি প্রকাশ, (৪) মুসলমান ভাইয়ের জন্য সর্বোত্তম দোয়া এবং (৫) মুসলমান ভাইয়ের সাথে এ চুক্তি যে, আমার হাত ও মুখ দ্বারা আপনার কোন কষ্ট হবে না। সহীহ্ হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ সে-ই প্রকৃত মুসলমান।”

আয়াতের বিষয়বস্তুর উপসংহারে বলা হয়েছেঃ

إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا

“আল্লাহ্ তাআলা প্রত্যেক বস্তুর হিসাব নিবেন।” মানুষ এবং ইসলামী অধিকার; যথা সালাম ও সালামের জওয়াব ইত্যাদি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্ তাআলা এগুলোরও হিসাব নিবেন। এরপর বলা হয়েছেঃ

اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ لَيَجْمَعَنَّكُمْ إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا رَيْبَ فِيهِ অর্থাৎ, আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তাকেই উপাস্য মনে কর এবং যে কাজই কর, তাঁর ইবাদতের নিয়তে কর। তিনি কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে একত্রিত করবেন। এতে কোন সন্দেহ নেই। ঐ দিন সবাইকে প্রতিদান দেবেন। কেয়ামতের ওয়াদা, প্রতিদান ও শাস্তির সংবাদ সব সত্য। وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا –কেননা, এ সংবাদ আল্লাহ্‌র দুআ। আল্লাহ্‌র চাইতে অধিক কার কথা সত্য হতে পারে?

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ