আল ফাতি‘হা, পৃষ্ঠা ৮-১০

সাহায্য-সহায়তা সম্পর্কিত এ ধারণা মু’মিন ও কাফির এবং ইসলাম ও কুফুরীর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। কুরআন একে ‘হারাম ও শির্‌ক্ ঘোষণা করেছে এবং কাফিরগণ একে সমর্থন করে এ অনুযায়ী ‘আমল  করছে। এ ব্যাপারে যেখানে সংশয়ের উদ্ভব হয় তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তার কোন কোন ফেরেশতার উপর পার্থিব ব্যবস্থা পরিচালনার অনেক দায়িত্ব অর্পণ করেছেন বলে বর্ণনা রয়েছে। এরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয় যে, ফেরেশতাগণকে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনে আল্লাহ্ নিজেই তো ক্ষমতা দিয়েছেন, তদনুরূপ নাবীগণকেও এমন কিছু কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছেন যা অন্য মানুষের ক্ষমতার উর্ধ্বে; যথা, মু’জিযা। অনুরূপ আউলিয়াগণকেও এমন কিছু কাজের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ করতে পারে না। যেমন, কারামাত। সুতরাং স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ধারণায় পতিত হওয়া বিচিত্র নয় যে, আল্লাহ্‌ তা‘আলা স্বীয় ক্ষমতার কিয়দংশ যদি তাদের মধ্যে না-ই দিতেন, তবে তাঁদের দ্বারা এমন সব কাজ কি করে হয়ে থাকে? এতে নাবী ও ওলীগণের প্রতি কর্মে স্বাধীন হওয়ার বিশ্বাস জন্মে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বরং মু’জিযা এবং কারামত একমাত্র আল্লাহ্‌রই কাজ। এর প্রকাশ নাবী ও ওলীগণের মাধ্যমে করে থাকেন শুধু তাঁর ’হিকমত ও রহস্য বুঝাবার জন্য। নাবী ও ওলীগণের পক্ষে সরাসরি এসব কাজ করার ক্ষমতা নেই। এ সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। যথা, ইরশাদ হয়েছে:

وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ ا للّٰهَ رَمَى

বদর যুদ্ধে রসূলুল্ল-হ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শত্রুসৈন্যদের প্রতি এক মুষ্টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন এবং সে কঙ্কর সকল শত্রু, শত্রু সৈন্যদের চোখে গিয়ে পড়েছিল। সে মু’জিযা সম্পর্কে এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘হে মু’হাম্মাদ(সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! এ কঙ্কর আপনি নিক্ষেপ করেননি, বরং আল্লাহ্ তা‘আলাই নিক্ষেপ করেছেন।’ এতে বুঝা যায় সে, নাবীগণের মাধ্যমে মু’জিযারূপে যেসব অস্বাভাবিক কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো ছিল আল্লাহ্‌রই কাজ। অনুরূপ, হযরত নূ’হ (’আলাইহিচ্ছালা-ম)-কে তাঁর জাতি বলেছিল যে, আপনি যদি সত্য নাবী হয়ে থাকেন, তবে যে শাস্তি সম্পর্কে আমাদিগকে ভীতি প্রদর্শন করেছেন, তা এনে দেখান। তখন তিনি বলেছিলেন: إنما يأتيكم به ا للّٰهُ -মু’জিযারূপে আসমানী বালা নিয়ে আসা আমার ক্ষমতার উর্ধ্বে। যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করেন, তবে আসবে। তখন তোমরা তা থেকে পালাতে পারবে না।

সূরা ইব্‌রাহীমে নাবী ও রসূলগণের এক দলের কথা উল্লেখিত হয়েছে। তারা বলেছেন:

وَمَا كَانَ لَنَا أَن نَّأْتِيَكُم بِسُلْطَانٍ إِلاَّ بِإِذْنِ اللّٰهِ

অর্থাৎ, “কোন মু’জিযা দেখানো আমাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ব্যতীত কিছুই হতে পারে না।” তাই কোন নাবী বা ওলী কোন মু’জিযা বা কারামত যখন ইচ্ছা বা যা ইচ্ছা দেখাবেন, এরূপ ক্ষমতা কাউকেই দেয়া হয়নি।

রসূল ও অন্যান্য নাবীগণকে মুশরিক্‌রা কত রকমের মু’জিযা দেখাতে বলেছে, কিন্তু যেগুলোতে আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হয়েছে সেগুলোই প্রকাশ পেয়েছে। আর যেগুলোতে আল্লাহ্‌র ইচ্ছা হয়নি, সেগুলো প্রকাশ পায়নি। কুরআনের সর্বত্র এ সম্পর্কিত তথ্য বিদ্যমান।

তাই এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সব কিছুই একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে এবং এতদসঙ্গে নাবী-রসূল ও ওলী-আউলিয়াগণের গুরুত্বের বিশেষভাবে স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। এ বিশ্বাস এবং স্বীকৃতি ব্যতীত আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি এবং তাঁর বিধানের অনুসরণ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। যেভাবে কোন ব্যক্তি বাল্‌ব ও পাখার গুরুত্ব অনুধাবন না করে একে নষ্ট করে দিয়ে আলো-বাতাস পাওয়ার আশা করতে পারে না, তেমনি নাবী-রসূল ও ওলী-আউলিয়াগণের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি ব্যতীত আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি আশা করা যায় না।

সাহায্য প্রার্থনা ও ওসীলা তালাশ করা এবং তা গ্রহণ করার প্রশ্নে নানা প্রকার প্রশ্ন ও সংশয়ের উৎপত্তি হতে দেখা যায়। আশা করা যায় যে, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা সে সংশয় ও সন্দেহের নিরসন হবে।

সির-ত্বল মুস্তাক্বীমের হিদায়াতই দ্বীন-দুনিয়ার সাফল্যের চাবিকাঠি:

আলোচ্য তাফসীরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, আল্লাহ্ তা‘আলা যে দু‘আকে সর্বক্ষণ সকল লোকের সকল কাজের জন্য নির্ধারিত করেছেন তা হচ্ছে সির-ত্বল মুস্তাক্বীমের হিদায়াতপ্রাপ্তির দু‘আ। এমনিভাবে আখিরাতের মুক্তি যেমন সে সরল পথে রয়েছে যা মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে, অনুরূপভাবে দুনিয়ার যাবতীয় কাজের উন্নতি-অগ্রগতিও সির-ত্বল মুস্তাক্বীম বা সরল পথের মধ্যেই নিহিত। যে সমস্ত পন্থা অবলম্বন করলে উদ্দেশ্য সফল হয়, তাতে পূর্ণ সফলতাও অনিবার্যভাবেই হয়ে থাকে।

যে সব কাজে মানুষ সফলতা লাভ করতে পারে না, তাতে গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, সে কাজের ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতিতে নিশ্চয়ই কোন ভূল হয়েছে।

সারকথা, সরল পথের হিদায়াত কেবল পরকাল বা দ্বীনী জীবনের সাফল্যের জন্যই নির্দিষ্ট নয়, বরং দুনিয়ার সকল কাজের সফলতাও এরই উপর নির্ভরশীল। এজন্যই প্রত্যেক মু’মিনের এ দু‘আ তাসবী‘হস্বরূপ সর্বদা স্মরণ রাখা কর্তব্য। তবে মনোযোগ সহকারে স্মরণ রাখতে ও দু‘আ করতে হবে; শুধু শব্দের উচ্চারণ যথেষ্ট নয়।

[আর সব বিষয়ে আল্লাহ্‌ই ভাল জ্ঞান রাখেন। ওয়ামা তাউফীক্বী ইল্লা- বিল্লা-হ…]

(বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর)

মূল: তাফসীরে মা‘আরিফুল ক্বুরআন

হযরত মাওলানা মুফতী মু‘হাম্মাদ শাফী’ র‘হমাতুল্ল-হি ‘আলাইহ

অনুবাদ ও সম্পাদনা:

মাওলানা মু‘হিউদ্দীন খান রহ,

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ