আল-বাকারা, আয়াত ১০৬-১১৯

পৃষ্ঠা নং-৫৭

সমভাবে প্রযোজ্য। তবে এই তিনটি মসজিদের বিশেষ মাহাত্ম্য ও সম্মান স্বতন্ত্রভাবে স্বীকৃত। মসজিদে-‘হারামে এক রকা‘আত নামাযের সওয়াব একলক্ষ রকা‘আত নামাযের সমান এবং মসজিদে নবভী ও বাইতুল-মোকাদ্দাসে পঞ্চাশ হাজার রকা‘আত নামাযের সমান। এই তিন মসজিদে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে সফর করে সেখানে পৌছা বিরাট সওয়াব ও বরকতের বিষয়। কিন্তু অন্য কোন মসজিদে নামায পড়া উত্তম মনে করে দূর-দূরান্ত থেকে সফর করে আসতে বারণ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ মসজিদে যিক্‌র ও নামাযে বাধা দেয়ার যত পন্থা হতে পারে সে সবগুলোই ‘‘হারাম। তন্মধ্যে ধ্যে একটি প্রকাশ্য পন্থা এই যে, মসজিদে গমন করতে অথবা সেখানে নামায ও তিলাওয়াত করতে পরিস্কার ভাষায় নিষেধাজ্ঞা প্রদান। দ্বিতীয় পন্থা এই যে, মসজিদে হট্টগোল করে অথবা আশে-পাশে গান-বাজনা করে মুসল্লীদের নামায ও যিক্‌রে বিঘ্ন সৃষ্টি করা।

এমনিভাবে নামাযের সময়ে যখন মুসল্লীরা নফল নামায, তাসবী‘হ, তিলাওয়াত ইত্যাদিতে নিয়োজিত থাকেন, তখন মসজিদে সরবে তিলাওয়াত ও যিক্‌র করা এবং নামাযীদের নামাযে বিঘ্ন সৃষ্টি করাও বাধা প্রাদানেরই নামান্তর। এ কারণেই ফিক্ব্‌হ্‌বিদগণ একে না-জায়েয আখ্যা দিয়েছেন। তবে, মসজিদে যখন মুসল্লী না থাকে, তখন সরবে যিক্‌র অথবা তিলাওয়াত করায় দোষ নেই।

এ থেকে আরও বোঝা যায় যে, যখন মুসল্লীরা নামায, তাসবী‘হ্‌ ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকে, তখন মসজিদে নিজের জন্যে অথবা কোন ধর্মীয় কাজের জন্যে চাঁদা সংগ্রহ করাও নিষিদ্ধ।

তৃতীয়তঃ মসজিদ জনশূন্য করার জন্য সম্ভবপর যত পন্থা হতে পারে সবই ‘‘হারাম। খোলাখুলিভাবে মসজিদকে বিধ্বস্ত করা ও জনশূন্য করা যেমনি এর অন্তর্ভূক্ত তেমনিভাবে এমন কারণ সৃষ্টি করাও এর অন্তর্ভূক্ত, যার ফলে মসজিদ জনশূন্য হয়ে যায়। মসজিদ জনশূন্য হওয়ার অর্থ এই যে, সেখানে নামায পড়ার জন্যে কেউ আসে না কিংবা নামাযীর সংখ্যা হ্রাস পায়।

মোটকথা, وَلِلَّهِ الۡمَشۡرِقُ وَالۡمَغۡرِبُۚ  আয়াতটিতে কিবলামুখী হওয়ার পূর্ণ স্বরূপ বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে যে, এর উদ্দেশ্য (না‘ঊযু বিল্লাহ) বাইতুল্লাহ্‌ অথবা বাইতুল-মোকাদ্দাসের পূজা করা নয়, কিংবা এ’দুটি স্থানের সাথে আল্লাহ্‌র পবিত্র সত্তাকে সীমিত করে নেয়াও নয়। তার সত্তা সমগ্র বিশ্বকে বেষ্টন করে রেখেছে এবং সর্বত্রই তার মনোযোগ সমান। এরপরও বিভিন্ন তাৎপর্যের কারণে বিশেষ স্থান অথবা দিককে কিবলা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

আয়াতের এই বিষয়বস্তুকে সু্স্পষ্ট ও অন্তরে বদ্ধমূল করার উদ্দেশেই সম্ভবতঃ হুযুরে আকরাম (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহ ওয়াসাল্লাম) ও সা‘হাবায়ে-কেরামকে হিজরতের প্রথম ষোল-সতের মাস পর্যন্ত বাইতুল-মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার আদেশ দেয়া হয়। এভাবে কার্যতঃ বলে দেয়া হয় যে, আমার মনোযোগ সর্বত্র রয়েছে। নফল নামাযসমূহের এক পর্যায়ে এই নির্দেশ অব্যাহত রাখা হয়েছে। সফরে কোন ব্যক্তি উট, ঘোড়া ইত্যাদি যানবাহনে সওয়ার হয়ে পথ চললে তাকে তদবস্থায় ইশারায় নফল নামায পড়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তার জন্য যানবাহন যেদিকে চলে সেদিকে মুখ করাই যথেষ্ট।

কোন কোন মুফাস্সির فَأَيۡنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجۡهُ اللَّهِۚ আয়াতকে এই নফল নামাযেরই  বিধান বলে সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু স্মরণ রাখা দরকার যে, এই বিধান সে সমস্ত যানবাহনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যাতে সওয়ার হয়ে চলার সময় কিবলার দিকে মুখ করা কঠিন। পক্ষান্তরে যেসব যানবাহনে সওয়ার হলে কিবলার দিকে মুখ করা কঠিন নয়, যেমন রেলগাড়ী, মাসুদ্রীক জাহাজ, উড়োজাহাজ ইত্যাদিতে নফল নামাযেও কিবলার দিকেই মুখ করতে হবে। তবে নামাযরত অবস্থায় রেলগাড়ী অথবা জাহাজের দিক পরিবর্তন হয়ে গেলে এবং আরোহীর পক্ষে কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার অবকাশ না থাকলে তদবস্থায়ই নামায পূর্ণ করবে।

এমনিভাবে কিবলার দিক সম্পর্কে নামাযীর জানা না থাকলে, রাত্রির অন্ধকারে দিক নির্ণয় করা কঠিন হলে এবং বলে দেয়ার লোক না থাকলে সেখানও নামাযী অনুমান করে যেদিকেই মুখ করবে, সেদিকই তার কিবলা বলে গণ্য হবে। নামায আদায় করার পর যদি দিকটি ভ্রান্তও প্রমাণিত হয়, তবুও তার নামায শুদ্ধ হয়ে যাবে- পূর্ণবার পড়তে হবে না।

জ্ঞাতব্যঃ (১) বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য বিশেষ ফেরেশতা নিযুক্ত করা- যেমন, বৃষ্টিবর্ষণ ও রিযিক পৌঁছানো ইত্যাদি কোন না কোন রহস্যের উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন উপকরণ ও শক্তিকে কাজে লাগানোও তেমনি। এর কোনটিই এজন্যে নয় যে, মানুষ এগুলোকে ক্ষমতাশালী স্বীকার করে তাদের কাছে সাহায্য চাইবে।

(২) ইমাম বায়যাভী বলেনঃ পূর্ববর্তী শরী‘আতসমূহে আদি কারণ হওয়ার দরুন আল্লাহ্‌কে ‘পিতা’ বলা হত। একেই মুর্খেরা জন্মদাতা অর্থে বুঝে নিয়েছে। ফলে এরূপ বিশ্বাস করা অথবা বলা কুফর সাব্যস্ত হয়েছে। অনিষ্টের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে বর্তমানেও এ জাতীয় শব্দ ব্যবহারের অনুমতি নেই।

জ্ঞাতব্যঃ ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা ছিল আসমানী কিতাবের অধিকারী। তাদের মধ্যে শিক্ষিত লোকও ছিল। তা সত্ত্বেও আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাদের মূর্খ বলে অভিহিত করেছেন। এর কারণ এই যে, প্রচুর অকাট্য ও শক্তিশালী নিদর্শন প্রতিষ্ঠিত করা সত্ত্বেও সেগুলো অস্বীকার মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ কারণেই আল্লাহ্‌ তাদেরকে মুর্খ বলে অভিহিত করেছেন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ