আল-বাকারা, আয়াত ১৬৫-১৭৭

পৃষ্ঠা নং-৮৭

জন্তুকে খাওয়ানোও জায়েয নয়৷ বরং সেগুলো এমন কোন স্থানে ফেলে দিতে হবে, যেন কুকুর-বিড়ালে খেয়ে ফেলে৷ নিজ হাতে উঠিয়ে কুকুর-বিড়ালকে খাওয়ানোও জায়েয হবে না৷— (জাসসাস, কুরতুবী)

মাসআলাঃ ‘মৃত’ শব্দটির অন্য কোন বিশেষণ ছাড়া সাধারণভাবে ব্যবহার করাতে প্রতীয়মান হয় যে, হারামের হুকুমও ব্যাপক এবং তন্মধ্যে মৃত জন্তুর সমুদয় অংশই শামিল৷ কিন্তু অন্য কোন আয়াতে عَلٰى طَاعِمٍ يَّطْعَمُهٗ শব্দ দ্বারা এ বিষয়টিও ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে৷ তাতে বুঝা যায় যে, মৃত জন্তুর শুধু সে অংশই হারাম যেটুকু খাওয়ার যোগ্য৷ সুতরাং মৃত জন্তুর হাড়, পশম প্রভৃতি যেসব অংশ খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় না, সেগুলো ব্যবহার করা হারাম নয়; সম্পুর্ণ জায়েয৷ কেননা, কুরআনের অন্য আয়াতে আছেঃ

وَمِنْ اَصْوَافِهَا وَاَوْبَارِهَا وَاَشْعَارِهَا اَثَاثًاوَّمَتَاعًا اَلٰى حِيْنٍ

এতে হালাল জানোয়ারসমুহের পশম প্রভৃতির দ্বারা ফায়দা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এখানে যবেহ করার শর্ত আরোপ করা হয়নি৷— (জাসসাস)

চামড়ার মধ্যে যেহেতু রক্ত প্রভৃতি নাপাকীর সংমিশ্রণ থাকে, সেজন্য মৃত জানোয়ারের চামড়া শুকিয়ে পাকা না করা পর্যন্ত নাপাক এবং ব্যবহার হারাম৷ কিন্তু পাকা করে নেয়ার পর ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েয৷ স‘হীহ ‘হাদীসে এ সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে৷— (জাসসাস)

মাসআলাঃ মৃত জানোয়ারের চর্বি এবং তদ্দ্বারা তৈরী যাবতীয় সামগ্রীই হারাম৷ এসবের ব্যবহার কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়৷ এমনকি এসবের ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম৷

রক্তঃ আলোচ্য আয়াতে যেসব বস্তু-সামগ্রীকে হারাম করা হয়েছে, তার দ্বিতীয়টি হচ্ছে রক্ত৷ এ আয়াতে শুধু রক্ত উল্লেখিত হলেও সুরা আন’আমের এক আয়াতে اَوْدَمًا مَّسْفُوْحًا অর্থাৎ ‘প্রবাহমান রক্ত’ উল্লেখিত রয়েছে৷ রক্তের সাথে ‘প্রবাহমান’ শব্দ সংযুক্ত করার ফলে শুধু সে রক্তকেই হারাম করা হয়েছে, যা যবেহ করলে বা কেটে গেলে প্রবাহিত হয়৷ এ কারণেই কলিজা-যকৃৎ প্রভৃতি জমাট বাঁধা রক্তে গঠিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফেকাহবিদগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী পাক ও হালাল।

মাসআলাঃ যেহেতু শুধুমাত্র প্রবাহমান রক্তই হারাম ও নাপাক, কাজেই যবেহ করা জন্তুর গোশতের সাথে রক্তের যে অংশ জমাট বেঁধে থেকে যায়, সেটুকু হালাল ও পাক৷ ফেকাহবিদ সাহাবী ও তাবে‘য়ীসহ সমগ্র আলেম সমাজ এ ব্যাপারে একমত৷ একই কারণে মশা-মাছি ও ছারপোকার রক্ত নাপাক নয়৷ তবে যদি রক্ত বেশী হয় এবং ছড়িয়ে যায়, তবে তা ধুয়ে ফেলা উচিত৷— (জাসসাস)

মাসআলাঃ রক্ত খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি অন্য কোন উপায়ে তা ব্যবহার করাও হারাম৷ অন্যান্য নাপাক রক্তের ন্যায় রক্তের ক্রয়-বিক্রয় এবং তদ্দ্বারা অর্জিত লাভালাভও হারাম৷ কেননা, কুরআনের আয়াতে ‘রক্ত’ শব্দটি অন্য কোন বিশেষণ ব্যতিতই ব্যবহৃত হওয়ার কারণে রক্ত বলতে যা বুঝায়, তার সম্পূর্ণটাই হারাম প্রতিপন্ন হয়ে গেছে৷

রুগীর গায়ে অন্যের রক্ত দেয়ার মাসআলাঃ এই মাসআলার বিশ্লেষণ নিম্নরুপঃ রক্ত মানুষের শরীরের অংশ৷ শরীর থেকে বের করে নেওয়ার পর তা নাপাক৷ তদনুসারে প্রকৃত প্রস্তাবে একজনের রক্ত অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করানো দু’কারণে হারাম হওয়া উচিত, প্রথমতঃ মানুষের যেকোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্মানিত এবং আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত৷ শরীর থেকে পৃথক করে নিয়ে তা অন্যত্র সংযোজন করা সে সম্মান ও সংরক্ষণ বিধানের পরিপন্থী৷ দ্বিতীয়তঃ এ কারণে যে, রক্ত ‘নাজাসাতে-গলীযা’ বা জঘন্য ধরনের নাপাকী৷ আর নাপাক বস্তুর ব্যবহার জায়েয নয়৷

তবে নিরুপায় অবস্থায় এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে ইসলামী শরী‘আত যেসব সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে চিন্তা-ভাবনা করলে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়৷

প্রথমতঃ রক্ত যদিও মানুষের শরীরেরই অংশ, তথাপি এটা অন্য মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত করার জন্য যার রক্ত, তার শরীরে কোন প্রকার কাটা-ছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না,— কোন অঙ্গ কেটে পৃথক করতে হয় না৷ সুঁই-এর মাধ্যমে একজনের শরীর থেকে রক্ত বের করে অন্যের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়৷ তদনুসারে রক্তকে দুধের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যা অঙ্গ কর্তন ব্যতিরেকেই একজনের শরীর থেকে বের হয়ে অন্যের শরীরের অংশে পরিণত হতে থাকে৷ শিশুর প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য করেই ইসলামী শরী‘আত মানুষের দুধকে শিশু খাদ্য হিসাবে নির্ধারিত করেছে এবং স্বীয় সন্তানকে দুধ-পান করানো মায়ের উপর ওয়াজিব সাব্যস্ত করে দিয়েছে৷

“অষুধ হিসাবে স্ত্রীলোকের দুধ পুরুষের পক্ষে নাকে প্রবেশ করানো কিংবা পান করায় দোষ নেই৷”— আলমগীরি

ইবনে কুদামাহ রচিত ‘মুগনী’ গ্রন্থে এ মাসআলা সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে৷— (মুগনী, কিতাবুস সাইদ, ৮ম খন্ডঃ ২০৬ পৃষ্ঠা)

রক্তকে যদি দুধের সাথে তুলনা করা হয়, তবে তা সামঞ্জস্যহীন হবে না। কেননা, দুধ রক্তেরই পরিবর্তিত রূপ এবং মানব-দেহের অংশ হওয়ার ব্যাপারেও একই পর্যায়ভুক্ত। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, দুধ পাক এবং রক্ত নাপাক। সুতরাং হারাম হওয়ার প্রথম কারণ অর্থাৎ, মানবদেহের অংশ হওয়ার ক্ষেত্রে তো নিষিদ্ধ হওয়ার ধারণা যুক্তিতে টেকে না। অবশিষ্ট থাকে দ্বিতীয় কারণ অর্থাৎ, নাপাক হওয়া। এক্ষেত্রেও চিকিৎসার বেলায় অনেক ফিকাহবীদ রক্ত ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন।

এমতাবস্থায় মানুষের রক্ত অন্যের দেহে স্থানান্তর করার প্রশ্নে শরী‘আতের নির্দেশ দাঁড়ায় এই যে, সাধারণ অবস্থায় এটা জায়েয নয়। তবে চিকিৎসার্থ, নিরুপায় অবস্থায় অষুধ হিসাবে ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে জায়েয। ‘নিরুপায় অবস্থায়’ অর্থ হচ্ছে রোগীর যদি জীবন-সংশয় দেখা দেয় এবং অন্য কোন অষুধ যদি তার জীবন রক্ষার জন্য কার্যকর বলে বিবেচিত না হয়, আর রক্ত দেয়ার ফলে তার জীবন-রক্ষার সম্ভাবনা যদি প্রবল থাকে, তবে সেসব অবস্থায় তার দেহে অন্যের রক্ত দেয়া কুরআন শরীফের সে আয়াতের মর্মানুযায়ীও জায়েয হবে, যে আয়াতে অনন্যোপায় অবস্থায় মৃত জন্তুর গোশত খেয়ে জীবন বাঁচানোর সরাসরি অনুমতি দেয়া হয়েছে।

আর যদি অনন্যোপায় না হয় এবং অন্য অষুধ ব্যবহারে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়, তবে সে অবস্থায় রক্ত ব্যবহারের প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে। কোন কোন ফিকাহবিদ একে জায়েয বলেছেন এবং কেউ না-জায়েয বলেছেন। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ ফিকাহ্‌র কিতাবসমুহে ‘হারাম-

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ