আল-বাকারা, আয়াত ১৬৫-১৭৭

পৃষ্ঠা নং- ৮৮

বস্তুর দ্বারা চিকিৎসা’ শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখিত হয়েছে।

          শূকর হারাম হওয়ার বিবরণঃ আলোচ্য আয়াতে তৃতীয় যে বস্তুটি হারাম করা হয়েছে, সেটি হল শূকরের গোশত। এখানে শূকরের সাথে ‘লাহম’ বা গোশত শব্দ সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ইমাম কুরতুবী বলেন,  এর দ্বারা শুধু গোশত হারাম একথা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং শূকরের সমগ্র অংশ অর্থাত, হাড়,  গোশত, চামড়া, চর্বি, রগ, পশম প্রভৃতি সবকিছুই সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। তবে ‘লাহম’ তথা গোশত যোগ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, শূকর অন্যান্য হারাম জন্তুর ন্যায় নয়, তাই এটি যবেহ করলেও পাক হয় না। কেননা, গোশত খাওয়া হারাম এমন অনেক জন্তু রয়েছে যাদের যবেহ করার পর সেগুলোর হাড়, চামড়া প্রভৃতি পাক হতে পারে। কিন্তু যবেহ করার পরও শূকরের গোশত হারাম তো বটেই, নাপাকও থেকে যায়। কেননা, এটি একাধারে যেমনি হারাম তেমনি ‘নাজাসে-আইন’ বা সম্পূর্ণ নাপাক। শুধুমাত্র চামড়া সেলাই করার কাজে শূকরের পশম দ্বারা তৈরী সুতা ব্যবহার করা জায়েয বলে ‘হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। –(জাসসাস, কুরতুবী)

          আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নামে যা যবেহ করা হয়ঃ আয়াতে উল্লেখিত চতুর্থ হারাম বস্তু হচ্ছে সেসব জীব-জন্তু, যা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো নামে যবেহ অথবা উতসর্গ করা হয়। সাধারণতঃ এর তিনটি উপায় প্রচলিত রয়েছে।

          প্রথমতঃ আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কন কিছুর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যা উতসর্গ করা হয় এবং যবেহ করার সময়ও সে নাম নিয়েই যবেহ করা হয়, যে নামে তা উতসর্গিত। এমতাবস্থায় যবেহকৃত জন্তু সমস্ত মত-পথের আলেম ও ফেকাহবিদগণের দৃষ্টিতেই হারাম ও নাপাক। এর কোন অংশের দ্বারাই ফায়দা গ্রহণ জায়েয হবে না। কেননা,  وَمَااُهِلَّ لِغَيْرِاللهِ بِهٖ  আয়াতে যে অবস্থার কথা বুঝানো হয়েছে এ অবস্থা এর সরাসরি নমুনা, যে ব্যাপারে কারো কোন মতভেদ নেই।

          দ্বিতীয় অবস্থা হচ্ছে, আল্লাহ্‌ ব্যতিত অন্য কোন কিছুর সন্তুষ্টি বা নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যা যবেহ করা হয়, তবে যবেহ করার সময় তা আল্লাহ্‌র নাম নিয়েই যবেহ করা হয়। যেমন, অনেক অজ্ঞ মুসলমান পীর-বুযুর্গগণের সন্তুষ্টি অর্জনের মানসে গরু, ছাগল, মুরগী ইত্যাদি মান্নত করে তা যবেহ করে থাকে। কিন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহ্‌র নাম নিয়েই তা যবেহ করা হয়। এ সুরতটিও ফকীহগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী হারাম এবং যবেহকৃত জন্তু মৃতের শামিল।

          তবে দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে এ সুরতটি সম্পর্কে কিছুটা মত-পার্থক্য রয়েছে। কোন কোন মুফাসসের এবং ফেকাহবিদ এ সুরতটিকেও আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যবেহকৃত জীবনের বিধানের অনুরূপ বিবেচনা করেছেন। যেমন, তাফসীরে বায়যাবীর টিকায় বলা হয়েছেঃ

          ‘সে সমস্ত জন্তুই হারাম, যা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নামে উৎসর্গ করা হয়। যবেহ করার সময় তা’আল্লাহর নামেই যবেহ করা হোক না কেন। কেননা, আলেম ও ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কোন জন্তুকে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নৈকট্য হাসিল করার উদ্দেশ্যে কোন মুসলমানও যবেহ করে, তবে সে ব্যক্তি ‘মুরতাদ’ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে এবং তার যবেহকৃত পশুটি মুরতাদের যবেহকৃত পশু বলে বিবেচিত হবে’।

          দুররে মুখতার কিতাবুয-যাবায়েহ অধ্যায়ে বলা হয়েছেঃ

          “-যদি কোন আমীরের আগমন উপলক্ষে তারই সম্মানার্থে কোন পশু যবেহ করা হয়, তবে যবেহকৃত সে পশুটি হারাম হয়ে যাবে। কেননা, এটাও তেমনি, আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নামে যা যবেহ করা হয়”- এ আয়াতের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত; যদিও যবেহ করার সময় আল্লাহ্‌র নাম নিয়েই তা যবেহ করা হয়। শামীও এ অভিমত সমর্থন করেছেন। -(দুররে-মুখতার, ৫ম খঃ, ২১৪ পৃঃ)

কেউ কেউ অবশ্য উপরোক্ত সুরতটিকে وَمَااُهِلَّ لِغَيْرِاللهِ بِهٖ  আয়াতের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না। কেননা, আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি অনুসারে একেবারে সরাসরি তা বুঝায় না। তবে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর নৈকট্য বা সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত দ্বারা ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর উদ্দেশ্যে যা উৎসর্গ করা হয়’  সে আয়াতের প্রতি যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় এ সুরতটিকে হারাম করা হয়েছে। আমাদের বিবেচনায় এ যুক্তিই সর্বাপেক্ষা শুদ্ধ ও সাবধানতাপ্রসূত।

উপরোক্ত সুরতটি হারাম হওয়ার সমর্থনে কুরআনের অন্য আর একটি আয়াতও দলীল হিসেবে পেশ করা যায়। সে আয়াতটি হচ্ছে-

وَمَاذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ  বাতিলপন্থীরা যেসব বস্তুর পূজা করে থাকে, সেই সবকিছুকে نصب বলা হয়। সেমতে আয়াতের অর্থ হয়ঃ সে সমস্ত পশু, যেগুলোকে বাতিল উপাস্যের উদ্দেশ্যে যবেহ করা হয়েছে।

‘আরবদের স্বভাব ছিল যে, যার উদ্দেশ্যে যবেহ করা হতো, যবেহ করার সময় তারস্বরে সে নামই উচ্চারণ করতে থাকতো। ব্যাপকভাবে তাদের মধ্যে এ রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য প্রত্যাশা- যা সংশ্লিষ্ট পশু হারাম হওয়ার মূল কারণ, সেটাকে ‘ইহলাল’ অর্থাৎ, ‘তারস্বরে নামোচ্চারণ’ শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়েছে।

ইমাম মুসলিম তাঁর উস্তায ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়ার সনদে হযরত আয়েশা সিদ্দীকার একটি দীর্ঘ ‘হাদীস বর্ণনা করেছেন। সে ‘হাদীসের শেষভাগে রয়েছে যে, একজন স্ত্রীলোক হযরত আয়েশা (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহা)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, হে উম্মুল মু’মিনীন। আজমী লোকদের মধ্যে আমাদের কিছুসংখ্যক দূর সম্পর্কের আত্নীয়-স্বজন রয়েছে। তাদের মধ্যে সব সময় কোন কা কোন উৎসব লেগেই থাকে। উৎসবের দিনে কিছু হাদিয়া-তোহফা তারা আমাদের কাছেও পাঠিয়ে থাকে। আমরা তাদের পাঠানো সেসব সামগ্রী খাবো কিনা? জবাবে হযরত আয়েশা (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহা) বলেছিলেন-

‘সে উৎসব দিবসের জন্যেই যেসব পশু যবেহ করা হয়, সেগুলো খেয়ো না, তবে তাদের ফলমূল ক্ষেত্রে পার। (তাফসীরে-কুরতুবী, ২য় খঃ, ২০৭ পৃঃ)

মোটকথা, দ্বিতীয় সুরতটি, যাতে নিয়ত থাকে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নৈকট্য লাভ, কিন্তু যবেহ করা হয় আল্লাহ্‌র নামেই, সেটিও হারাম হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছুর সন্তুষ্টি যা নৈকট্য অর্জন, এর মধ্যে সামঞ্জস্য থাকার দরুন وَمَااُهِلَّ لِغَيْرِاللهِ بِهٖ  আয়াতের হুকুম দ্বিতীয় আয়াত وَمَاذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ -এরও প্রতিপাদ্য সাব্যস্ত হওয়ায় এ শ্রেণীর পশুর গোশতও হারাম।

তৃতীয় সুরত হচ্ছে পশুর কান কেটে অথবা শরীরের অন্য কোথাও কোন চিহ্ন অঙ্গিত করে কোন দেব-দেবী বা পীর-ফকীরের নামে ছেড়ে-

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ