আল-বাকারা, আয়াত ১৬৫-১৭৭

পৃষ্ঠা নং-৮৯

দেয়া হয়৷ সেগুলো দ্বারা কোন কাজ নেয়া হয় না , যবেহ করাও উদ্দেশ্য থাকে না৷ বরং যবেহ করাকে ‘হারাম মনে করে৷ এ শ্রেণীর পশু আলোচ্য দু’’আয়াতের কোনটিরই আওতায় পড়ে না৷ এ শ্রেণীর পশুকে কুরআনের ভাষায় ‘বা‘হীরাহ’ বা ‘সা-ইবাহ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে৷ এ ধরনের পশু সম্পর্কে হুকুম হচ্ছে যে, এ ধরনের কাজ অর্থাৎ, কারো নামে কোন পশু প্রভৃতি জীবন্ত উৎসর্গ করে ছেড়ে দেয়া কুরআনের সরাসরি নির্দেশ অনুযায়ী ‘হারাম৷ যেমন বলা হয়েছেঃ

مَاجَعَلَ اللهُ مِنْ بَحِيْرَةٍ وَّلَا سَائِبَةٍ

“আল্লাহ তা‘আলা ‘বা‘হীরাহ’ বা ‘সা-ইবাহ’ সম্পর্কে কোন বিধান দেননি৷ তবে এ ধরনের ‘হারাম আমল কিংবা সংশ্লিষ্ট পশুটিকে ‘হারাম মনে করার ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণেই সেটি ‘হারাম হয়ে যাবে না৷ বরং ‘হারাম মনে করাতেই তাদের একটা বাতিল মতবাদকে সমর্থন এবং শক্তি প্রদান করা হয়৷ তাই এরূপ উৎসর্গকৃত পশু অন্যান্য সাধারণ পশুর মতই ‘হালাল৷”

শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পশুর উপর তার মালিকের মালিকানা বিনষ্ট হয় না, যদিও সে ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে এরূপ মনে করে যে,  এটি আমার মালিকানা থেকে বের হয়ে যে নামে উৎসর্গ করা হয়েছে তারই মালিকানায় পরিণত হয়েছে৷ কিন্তু শরী‘আতের বিধানমতে যেহেতু তার সে উৎসর্গীকরণই বাতিল,  সুতরাং সে পশুর উপর তারই পরিপূর্ণ মালিকানা কায়েম থাকে৷ সে মতে উৎসর্গকারী যদি সে পশু কারো নিকট বিক্রয় করে কিংবা অন্য কাউকে দান করে,  তবে তা ক্রেতা ও দানগ্রহীতার জন্য ‘হালাল৷ পৌত্তলিক সমাজের অনেকেই মন্দির বা দেব-দেবীর নামে পশু-পাখী উৎসর্গ করে সেগুলো পূজারী বা সেবায়েতদের হাতে তুলে দেয়৷ সেবায়েতরা সেসব পশু বিক্রয় করে থাকে৷ এরূপ পশু ক্রয় করা সম্পূর্ণ ‘হালাল৷

এক শ্রেণীর কুসংস্কারগ্রস্ত মুসলমানকেও পীর-বুযুর্গের মাজারে ছাগল-মুরগী ইত্যাদি ছেড়ে আসতে দেখা যায়৷ মাজারের খাদেমরাই সাধারণতঃ উৎসর্গীকৃত সেসব জন্তু ভোগ-দখল করে৷ যেহেতু মূল মালিক খাদেমদের হাতে এগুলো ছেড়ে যায় এবং এগুলোর ব্যাপারে খাদেমদের পূর্ণ এখতিয়ার থাকে,  সেহেতু এ শ্রেণীর জীব-জন্তু ক্রয় করা,  যবেহ করে খাওয়া,  বিক্রয় করে লাভবান হওয়া সম্পূর্ণ ‘হালাল৷

‪‎গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ এ ক্ষেত্রে কুরআন কারীম মরণাপন্ন অবস্থায়ও ‘হারাম বস্তু খাওয়াকে ‘হালাল বা বৈধ বলেনি বলেছে فلا جناح عليه ” তবে তার কোন পাপ নেই”৷ এর মর্ম এই যে, এসব বস্তু তখনও যথারীতি ‘হারামই রয়ে গেছে, কিন্তু যে লোক খাচ্ছে তার অনন্যোপায় অবস্থার প্রেক্ষিতে ‘হারাম খাদ্য গ্রহণের পাপ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে৷

আলোচ্য আয়াতের দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের লোভে শরী‘আতের হুকুম-আ‘হকাম পরিবর্তিত করে এবং তার বিনিময়ে যে ‘হারাম ধন-সম্পদ গ্রহণ করে, তা যেন সে নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরে৷ কারণ, এ কাজের পরিণতি তাই৷ কোন কোন বিজ্ঞ আলেমের মতে প্রকৃতপক্ষে ‘হারাম মাল বা ধন-সম্পদ সবই দোযখের আগুন৷ অবশ্য তা যে আগুন, সে কথা পার্থিব জীবনে উপলব্ধি করা যায় না, কিন্তু মৃত্যুর পর তার সে কর্মই আগুনের রুপ ধরে উপস্থিত হবে৷

মুসলমানদের কেবলা যখন বায়তুল-মোকাদ্দাসের দিক থেকে পরিবর্তিত করে বায়তুল্ল-হর দিকে নির্ধারণ করা হলো, তখন ইহুদী, খ্রীষ্টান, পৌত্তলিক প্রভৃতি যারা সর্বদা মুসলমানদের মধ্যে ত্রুটি তালাশ করার ফিকিরে থাকতো, তারা তৎপর হয়ে উঠলো এবং নানাভাবে রসূলুল্ল-হ্ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও ইসলামের প্রতি অবিরাম নানা প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করতে শুরু করল৷ এসব প্রশ্নের জবাব পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে দেয়া হয়েছে৷

আলোচ্য একটি আয়াতে বিশেষ বর্ণনাভঙ্গির মাধ্যমে এ বিতর্কের যতি টেনে দেয়া হয়েছে৷ যার সারমর্ম হচ্ছে এই যে, নামাযে পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে কি পশ্চিমদিকে, এ বিষয় নির্ধারণকেই যেন তোমরা দ্বীনের একমাত্র লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছ এবং এ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করেই তোমাদের যাবতীয় আলোচনা-সমালোচনা আবর্তিত হতে শুরু করেছে৷ মনে হয়, তোমাদের ধারণায় শরী‘আতের অন্য কোন হুকুম-আহকামই যেন আর নেই৷

অন্য অর্থে এ আয়াতের লক্ষ মুসলমান, ইহুদী, নাসারা নির্বিশেষে সবাই হতে পারে৷ এমতাবস্থায় আয়াতের অর্থ দাঁড়াবে এই যে, প্রকৃত পুণ্য বা নেকী আল্ল-হ তা’আলার আনুগত্যের ভেতরেই নিহিত৷ যেদিকে মুখ করে তিনি নামাযে দাঁড়াতে নির্দেশ দেন, সেটাই শুদ্ধ ও পুণ্যের কাজে পরিণত হয়ে যায়৷ অন্যথায়, দিক হিসাবে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণের কোনই বৈশিষ্ট নেই৷ দিকবিশেষের সাথে কোন পুণ্যও সংশ্লিষ্ট নয়৷ পুণ্য-একান্তভাবেই আল্ল-হ্ তা’আলার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের সাথে সম্পৃক্ত৷ তাই আল্ল-হ তা’আলা যতদিন বায়তুল মোকাদ্দাসের প্রতি মুখ করে নামায পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন, ততদিন সেদিকে মুখ করাই ছিল পুণ্য৷ আবার যখন মসজিদুল ‘হারামের দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর হুকুম হয়েছে, এখন এ হুকুমের আনুগত্য করাই পুণ্যে পরিণত হয়েছে৷

আলোচ্য ১৭৭ তম আয়াত থেকে সূরা-বাক্বারার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে৷ এ অধ্যায়ে মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে তা’লীম ও হিদায়াত প্রদানই মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রসঙ্গতঃ এতে বিরুদ্ধবাদীদের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেয়া হয়েছে৷ সে হিসেবে আলোচ্য এ আয়াতটিকে ইসলামের বিধি-বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাপক অর্থবহ আয়াত বলে অভিহিত করা যায়৷

অতঃপর সূরার শেষ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এ আয়াতেরই ব্যাখ্যা করা হয়েছে৷ আলোচ্য এ আয়াতে ই’তিকাদ বা বিশ্বাস,  ই’বাদত, মু’আমালাত বা লেনদেন এবং নৈতিকতা ও আখলাক সম্পর্কিত বিধি-বিধানের মূলনীতিসমূহের আলোচনা মোটামুটিভাবে এসে গেছে৷ প্রথম বিষয়— ই’তেকাদ বা মৌলবিশ্বাস সম্পর্কিত আলোচনা من امن بالله শীর্ষক আয়াতে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে৷

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ই’বাদত এবং মু’আমালাত সম্পর্কিত৷ তার মধ্যে ই’বাদত সম্পর্কিত আলোচনা واتى الزكوة পর্যন্ত উল্লেখিত হয়েছে৷ অতঃপর মুআ’মালাতের আলোচনা والموفون بعهدهم শীর্ষক আয়াতে করা হয়েছে৷ এরপর আখলাক সম্পর্কিত আলোচনা والصبرين থেকে বর্ণিত হয়েছে৷

সবশেষে বলা হয়েছে যে, সে সমস্ত লোকই সত্যিকার মু’মিন, যারা এসব নির্দেশাবলীর পরিপূর্ণ অনুসরণ করে এবং এসব লোককেই প্রকৃত মুত্তাকী বলা যেতে পারে৷

অতঃপর আলোচ্য আয়াতে প্রথমে ধন-সম্পদ ব্যয় করার দুটি গুরু-

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ