আল-বাকারা ১৭৮-১৮৭

পৃষ্ঠা নং-৯১

এতে আলোচ্য বিষয়ই আরো বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। সেমতে শরী‘আতের পরিভাষায় ‘কিসাস’ বলা হয় হত্যা এবং আঘাতের সে শাস্তিকে, যা সমতা ও পরিমাণের প্রতি লক্ষ রেখে বিধান করা হয়।

          মাসআলাঃ ইচ্ছাকৃত হত্যা বলা হয় কোন অস্ত্র কিংবা এমন কোন কিছুর দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা, যার দ্বারা রক্ত প্রবাহিত হয় অথবা হত্যা সংঘটিত হয়— ‘কিসাস’ অর্থাৎ, ‘জানের বদলায় জান’ এ ধরনের হত্যার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

          মাসআলাঃ এ ধরনের হত্যার অপরাধে যেমন স্বাধীন ব্যক্তির হত্যাকারী অন্য স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে, তেমনি কোন ক্রীতদাসের বদলায়ও স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। অনুরূপ স্ত্রীলোক হত্যার অপরাধে পুরুষকে এবং পুরুষ হত্যার অপরাধে স্ত্রীলোককেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে।

           এ আয়াতে স্বাধীন ব্যক্তির বদলায় ব্যক্তি এবং স্ত্রীলোকের বদলায় স্ত্রী লোককে মৃত্যুদন্ড দেয়ার যে কথা উল্লেখিত হয়েছে, তা সেই একটা বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে, যে ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াতটি নাযিল হয়।

মাসআলাঃ ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে যদি হত্যাকারীকে সম্পূর্ণ মাফ করে দেয়া হয়, – যেমন নিহত ব্যক্তির ওয়ারিস মাত্র দুই পুত্র, সে দুজনই যদি মাফ করে দেয়, তবে এমতাবস্থায় হত্যাকারীর উপর কোন কিছু ওয়াজিব হবে না। সে ব্যক্তি সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি পূর্ণ মাফ না হয়, অর্থাৎ, উপরোক্ত ক্ষেত্রে এক পুত্র মাফ করে, কিন্তু অপর পুত্র তা না করে, তবে এমতাবস্থায় হত্যাকারী কিসাস- এর দন্ড থেকে অব্যাহতি পাবে সত্য, কিন্তু এক পুত্রের দাবীর বদলায় অর্ধেক দিয়্যত প্রদান করতে হবে।

          শরী‘আতের বিধানে হত্যার বদলায় যে দিয়্যত বা অর্থদন্ড প্রদান করতে হয়, তার পরিমাণ  হচ্ছে মধ্যম আকৃতির একশ’ উট, অথবা এক হাজার দীনার কিংবা দশ হাজার দেরহাম। বর্তমানকালের প্রচলিত ওজন অনুপাতে এক দেরহাম- সাড়ে তিন মাসা রৌপ্যের সমপরিমাণ। সেমতে পূর্ণ দিয়্যত-এর পরিমাণ হবে দু’হাজার নয়শ’ তোলা আট মাসা রৌপ্য।

          মাসআলাঃ কিসাস-এর আংশিক দাবী মাফ হয়ে গেলে যেমন মৃত্যুদন্ড মওকুফ হয়ে দিয়্যত ওয়াজিব হয়, তেমনি উভয়পক্ষ যদি কোন নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ প্রদানের শর্তে আপোষ-নিষ্পত্তি করে ফেলে, তবে সে অবস্থাতেও, ‘কিসাস’ মওকুফ হয়ে অর্থ প্রদান করা ওয়াজিব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে, যা ফেকাহর কিতাবসমূহে বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

মাসআলাঃ নিহত ব্যক্তির যে ক’জন ওয়ারিশ থাকবে, তাঁদের প্রত্যেকেই ‘মীরাস’- এর অংশ অনুপাতে ‘কিসাস’ ও দিয়্যত-এর মালিক হবে এবং দিয়্যত হিসাবে প্রাপ্ত অর্থ ‘মীরাস’-এর অংশ অনুপাতে বণ্টিত হবে। তবে কিসাস যেহেতু বণ্টনযোগ্য নয়, সেহেতু ওয়ারিশগণের মধ্য থেকে যে কোন একজনও যদি কিসাস-এর দাবী ত্যাগ করে, তবে তার উপর কিসাস ওয়াজিব হবে না; বরং দিয়্যত ওয়াজিব হবে এবং প্রত্যেকেই অংশ অনুযায়ী দিয়্যতের ভাগ পাবে।

মাসআলাঃ ‘কিসাস’ গ্রহণ করার অধিকার যদিও নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারিগণের, তথাপি নিজেরা সে অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। অর্থাৎ, নিহত ব্যক্তির বদলায় হত্যাকারীকে তারা নিজেরা হত্যা করতে পারবে না। এ অধিকার আদায় করার জন্য আইন কর্তৃপক্ষের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। কেননা, কোন অবস্থায় কিসাস ওয়াজিব হয় এবং কোন অবস্থায় হয় না, এ সম্পর্কিত অনেক সুক্ষ্ম দিকও রয়েছে, যা সবার পক্ষে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা রাগের মাথায় বাড়াবাড়িও করে ফেলতে পারে, এজন্য আলেম ও ফেকাহবিদগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী ‘কিসাস’-এর হক আদায় করার জন্য ইসলামী আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। —(কুরতুবী)

          ১৮০ নং আয়াতে মৃত্যূপথযাত্রীর প্রতি (যদি সে কিছু ধন-সম্পদ রেখে যায়) যে ওসীয়ত ফরয করা হয়েছে, সে নির্দেশের তিনটি অংশ বর্ণিত হয়েছে।

          (এক) মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে সন্তান-সন্তুতি ছাড়া অন্যান্য নিকটাত্নীয়দের কোন অংশ যেহেতু নির্ধারিত নেই, সুতরাং তাদের হক মৃত ব্যক্তির ওসীয়তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

          (দুই) এ ধরনের নিকটাত্নীয়দের জন্য ওসীয়ত করা মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির উপর ফরয।

          (তিন) এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তির বেশী ওসীয়ত করা জায়েয নয়।

          উপরোক্ত তিনটি নির্দেশের মধ্যে প্রথম নির্দেশটি সাহাবী ও তাবে‘য়ীগণের মতে ‘মীরাস’- এর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর ‘মানসুখ’ বা রহিত হয়ে গেছে। ইবনে কাসীর ও হাকেম প্রমুখ সহীহ সনদের সাথে বর্ণনা করেন যে, হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাস (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর মতে ওসীয়ত-সম্পর্কিত এ নির্দেশটি মীরাস-এর আয়াত দ্বারা রহিত করে দেয়া হয়েছে। মীরাস-সম্পর্কিত আয়াতটি হচ্ছেঃ

لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا

          হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাস (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, মীরাসের আয়াত সে সমস্ত আত্নীয়দের জন্য ওসীয়ত করা রহিত করে দিয়েছে, যাদের মীরাস নির্ধারিত ছিল। এছাড়া অন্যান্য যেসব আত্নীয়ের অংশ মীরাসের আয়াতে নির্ধারণ করা হয়নি, তাদের জন্য ওসীয়ত করার হুকুম এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। –(জাসসাস, কুরতুবী)

          তবে আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে, যেসব আত্নীয়ের জন্য মীরাসের আয়াতে কোন অংশ নির্ধারণ করা হয়নি, তাদের জন্য ওসীয়ত করা মৃত্যুপথযাত্রীর পক্ষে ফরয বা জরুরী নয়। সে ফরয রহিত হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজনবিশেষে এটা মুস্তাহাবে পরিণত হয়েছে। –(জাসসাস, কুরতুবী)

          ওসীয়ত ফরয হওয়া প্রসঙ্গেঃ ওসীয়ত সম্পর্কিত এ আয়াতের নির্দেশ একাধারে যেমন কুরআনের মীরাস-সম্পর্কিত আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে, তেমনি বিদায় হজ্বের সময় রসূলুল্ল-হ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কর্তৃক ঘোষিত নির্দেশের মাধ্যমেও হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাস (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর বর্ণিত ‘হাদীসটি রহিত হয়ে গেছে। বিদায় হজ্বের বিখ্যাত খোতবায় রসূলুল্ল-হ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)  ইরশাদ করেছিলেনঃ

إن الله أعطى لكل ذى حق حقه فلا وصية لوارث –

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ