আল-বাকারা ১৭৮-১৮৭

পৃষ্ঠা নং-৯৩

শব্দের মর্মার্থ হচ্ছে, যে সফরের অবস্থায় থাকে৷ এতে বোঝা যায় যে, বাড়ীঘর থেকে পাঁচ-দশ মাইল দূরে গেলেই তা সফর বলে গণ্য হবে না৷ তবে সফর কতটুকু দীর্ঘ হতে হবে, সে সীমারেখা কুরআনে উল্লেখিত হয়নি৷ রসুলুল্ল-হ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)— এর ‘হদীস এবং সাহাবীগণের আমলের উপর ভিত্তি করে ইমাম আবূ ‘হানিফা (র‘হিমাহুল্ল-হ) এবং অন্যান্য কিছুসংখ্যক ফেকাহবিদের মতে এ সফর কমপক্ষে তিন মানযিল দূরত্বের হতে হবে৷ অর্থাৎ, একজন লোক স্বাভাবিকভাবে পায়ে হেঁটে তিন দিনে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, ততটুকু দূরত্বের সফরকে সফর বলে উল্লেখ করেছেন৷ পরবর্তী যুগের ‘আলেমগণ ‘মাইল’— এর হিসাবে এ দূরত্ব আটচল্লিশ মাইল নির্ধারণ করেছেন৷

‎দ্বিতীয় মাসআলাঃ على سفر শব্দ দ্বারা একথাও বোঝা যায় যে, মুসাফির, এর প্রতি রোযার ব্যাপারে সফরজনিত ‘রুখসত’ ততক্ষণই প্রযোজ্য হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে সফর অবস্থায় থাকে৷ তবে স্বভাবতঃই সফর চলা অবস্থায় কোথাও সাময়িক যাত্রাবিরতি সফরের ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটায় না৷ নবী কারীম (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ‘হাদীস মতে এ যাত্রাবিরতির মেয়াদ ঊর্ধ্বপক্ষে পনের দিনের কম সময় হতে হবে৷ কেউ যদি সফরের মধ্যেই কোথাও পনের দিন অবস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে সে আর ‘সফরের মধ্যে’ থাকে না৷ ফলে সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে সফরজনিত ‘রুখসত’ ও প্রযোজ্য হবে না৷

‎মাসআলাঃ উল্লেখিত বাক্যাংণ দ্বারা একথাও বোঝায় যে, কেউ যদি সফরের মধ্যে কোন এক জায়গায় নয়; বরং বিভিন্ন জায়গায় মোট পনের দিনের যাত্রাবিরতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার সফরের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে না৷ সে সফর-জনিত রুখসত বা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবে৷

‎রোযার কাযাঃ فعدة من ايام اخر অর্থাৎ, রুগ্ন বা মুসাফির ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় কিংবা সফরে যে কয়টি যে কয়টি রোযা রাখতে পারবে না, সেগুলো অন্য সময় হিসাব করে কাযা করা ওয়াজিব৷ এতে বলা উদ্দেশ্য ছিল যে, রোগজনিত কারণে কিংবা সফরের অসুবিধায় পতিত হয়ে যে ক’টি রোযা ছাড়তে হয়েছে, সে ক’টি রোযা অন্য সময় পূরণ করে নেয়া তাদের উপর ওয়াজিব৷ এ কথাটি বোঝানোর জন্যে فعليه القضاء ” তার উপর কাযা ওয়াজিব,” এতটুকু বলাই যথেষ্ট ছিল৷ কিন্তু তা না বলে فعدة من ايام اخر বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, রুগ্ন এবং মুসাফিরদের অপরিহার্য রোযার মধ্যে শুধু সে পরিমাণ রোযার কাযা করাই ওয়াজিব, রুগী সুস্থ হওয়ার পর এবং মুসাফির বাড়ী ফেরার পর যে কয় দিনের সুযোগ পাবে৷ কিন্তু সে ব্যক্তি যদি এতটুকু সময় না পায় এবং এর আগেই মৃত্যুবরণ করে, তবে তার উপর কাযা কিংবা ‘ফিদইয়া’র জন্য ওসীয়ত করা জরুরী নয়৷

মাসআলাঃ فعدة من ايام اخر বাক্যে যেহেতু এমন কোন শর্তের উল্লেখ নেই, যদ্বারা বোঝা যেতে পারে যে, এ রোযা একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে রাখতে হবে, না মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে রাখলেও চলবে, সুতরাং যার রমযানের প্রথম দশ দিনের রোযা ফউত (ছুটে গেছে) হয়েছে সে যদি প্রথম দশ তারিখের কাযা করে, পরে নয় তারিখের, তারপর আট তারিখের কাযা হিসাবে করতে থাকে, তবে তাতে কোন অসুবিধা হবে না৷ অনুরূপভাবে দশটি রোযার মধ্যে দু’চারটি করার পর বিরতি দিয়ে দিয়ে অবশিষ্টগুলো কাযা করলেও কোন অসুবিধা হবে না৷ কেননা, আয়াতের মধ্যে এরূপভাবে কাযা করার ব্যাপারেও কোন নিষেধাজ্ঞা উল্লেখিত হয়নি৷

‎রোযার ফিদইয়াঃ وعلى الذين يطيقونه আয়াতের স্বাভাবিক অর্থ দাঁড়ায়, যেসব লোক রোগজনিত কারণে কিংবা সফরের দরুন নয়; বরং রোযা রাখার পূর্ণ সামর্থ থাকা সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না, তাদের জন্যেও রোযা না রেখে রোযার বদলায় ‘ফিদইয়া’ দেয়ার সুযোগ রয়েছে৷ কিন্তু সাথে সাথেই এতটুকু বলে দেয়া হয়েছে যে, وان تصوموا خيرلكم অর্থাৎ, রোযা রাখাই হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর৷

উপরোক্ত নির্দেশটি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের, যখন লক্ষ্য ছিল ধীরে ধীরে লোকজনকে রোযায় অভ্যস্ত করে তোলা৷ এরপর অবতীর্ণ আয়াত فمن شهد منكم الشهرفليصمه— এর দ্বারা প্রাথমিক এ নির্দেশ সুস্থ-সবল লোকদের ক্ষেত্রে রহিত করা হয়েছে৷ তবে যেসব লোক অতিরিক্ত বার্ধক্যজনিত কারণে রোযা রাখতে অপারক কিংবা দীর্ঘকাল রোগ ভোগের দরুন দুর্বল হয়ে পড়েছে, অথবা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে একেবারেই নিরাশ হয়ে পড়েছে, সেসব লোকের বেলায় উপরোক্ত নির্দেশটি এখনো প্রযোজ্য রয়েছে৷ সাহাবী ও তাবে‘য়ীগণের সর্বসম্মত অভিমত তাই৷—(জাসসাস, মাযহারী)

বুখারী, মুসলিম, আবু দাঊদ, নাসায়ী ও তিরমিযী প্রমুখ হাদীসের সমস্ত ইমামগণই সাহাবী হযরত সালামা-ইবনুল আকওয়া (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর সে বিখ্যাত ‘হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন যাতে বলা হয়েছে যে, যখন وعلى الذين يطيقونه শীর্ষক আয়াতটি নাযিল হয়, তখন আমাদেরকে এ মর্মে এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল যে, যার ইচ্ছা হয় সে রোযা রাখতে পারে এবং যে রোযা রাখতে না চায়, সে ‘ফিদইয়া’ দিয়ে দেবে৷ এরপর যখন পরবর্তী আয়াত فمن شهد منكم الشهر فليصمه নাযিল হলো, তখন ‘ফিদইয়া’ দেয়ার এখতিয়ার রহিত হয়ে সুস্থ-সামর্থ লোকদের উপর শুধুমাত্র রোযা রাখাই জরুরী সাব্যস্ত হয়ে গেল৷

ফিদইয়ার পরিমাণ এবং আনুষঙ্গিক মাসআলাঃ একটি রোযার ফিদইয়া অর্ধ সা’ গম অথবা তার মূল্য৷ আমাদের দেশে প্রচলিত আশি তোলার সের হিসাবে অর্ধ সা’ একসের সাড়ে বার ছটাক হয়৷ এই পরিমাণ গম অথবা নিকটবর্তী প্রচলিত বাজার দর অনুযায়ী তার মূল্য কোন মিসকীনকে দান করে দিলেই একটি রোযার ‘ফিদইয়া’ আদায় হয়ে যায়৷ ফিদইয়া কোন মসজিদ বা মাদ্রাসায় কার্যরত কোন লোকের খেদমতের পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া জায়েয নয়।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ