আল-বাকারা ১-১৫

পৃষ্ঠা নং-১৬

অগণিত লোক সৃষ্টি হয়েছিলেন, যাদের চাল-চলন এবং আচার-আচরণ দেখেই মানুষ ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়তো।

এখন লক্ষণীয় আর একটি বিষয় হচ্ছে, আয়াতের শেষে يُؤۡمِنُون শব্দ ব্যবহার না করে يُوقِنُون ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, বিশ্বাসের বিপরীতে অবিশ্বাস এবং ইয়াক্বীনের বিপরীতে সন্দেহ-সংশয়। এ শব্দ দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হলেই শুধু উদ্দেশ্য সফল হয় না, বরং এমন দৃঢ় প্রত্যয় রাখতে হবে, যে প্রত্যয় স্বচক্ষে দেখা কোন বস্তু সম্পর্কেই হতে পারে।

মুত্তাক্বীদের এই গুণ পরকালে আল্লাহ্ তা‘আলার সম্মুখে উপস্থিতি এবং হিসাব-নিকাশ, প্রতিদান এবং সবকিছুরই একটি পরিপূর্ণ নকশা তার সামনে দৃশ্যমান করে রাখবে। যে ব্যক্তি অন্যের হক বা অধিকার নষ্ট করার জন্য মিথ্যা মামলা করে বা মিথ্যা সাক্ষী দেয়, আল্লাহ্‌র আদেশের বিপরীত পথে ‘‘হারাম ধন-সম্পদ উপার্জন করে এবং দুনিয়ার হীন উদ্দেশ্য সফল করার জন্য শরী’আত বিরোধী কাজ করে, সে ব্যক্তি পরকালে বিশ্বাসী হয়ে, প্রকাশ্যে ঈমানের কথা যদি স্বীকার করে এবং শরী’আতের বিচারে তাকে মু’মিনও বলা হয়, কিন্তু কুরআন যে ইয়াক্বীনের কথা ঘোষণা করেছে, এমন লোকের মধ্যে সে ইয়াক্বীন থাকতে পারে না। আর সে কুরআনী ইয়াক্বীনই মানবজীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। আর এর পরিণামেই মুত্তাক্বীগণকে হিদায়াত বলা হয়েছে যে, তারাই সরল-সঠিক পথের পথিক, যা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে দান করা হয়েছে আর তারাই সম্পূর্ণ সফলকাম হয়েছে।

সূরা বাক্বরার প্রথম পাঁচটি আয়াতে কুরআনকে হিদায়াত বা পথপ্রদর্শনের গ্রন্থরূপে ঘোষণা করে সকল সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়ার পর সে সমস্ত ভাগ্যবান ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা এ গ্রন্থের হিদায়াতে পরিপূর্ণভাবে উপকৃত ও লাভবান হয়েছেন এবং যাঁদেরকে কুরআনের পরিভাষায় মু’মিন ও মুত্তাক্বী উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁদের বৈশিষ্ট্য, গুণাবলী এবং পরিচয়ও বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তী পনেরটি আয়াতে সে সমস্ত লোকের বিষয় আলোচিত হয়েছে, যারা এ হিদায়াতকে অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করে বিরুদ্ধাচরণ করেছে।

এরা দু’টি দলে বিভক্ত। একদল প্রকাশ্যে কুরআনকে অস্বীকার করে বিরুদ্ধাচরণের পথ অবলম্বন করেছে। কুরআন তাদেরকে কাফির বলে আখ্যায়িত করেছে। অপর দল হচ্ছে, যারা হীন পার্থিব উদ্দেশ্যে অন্তরের ভাব ও বিশ্বাসের কথাটি খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতে সাহস পায়নি, বরং প্রতারণার পথ অবলম্বন করেছে; মুসলমানদের নিকট বলে, আমরা মুসলামন; কুরআনের হিদায়াত মানি এবং আমরা তোমাদের সাথেই আছি। অথচ তাদের অন্তরে লুকায়িত থাকে কুফ্‌র্ ও অস্বীকৃতি। আবার কাফিরদের নিকট গিয়ে বলে, আমরা তোমাদের ধলভুক্ত, তোমাদের সাথেই রয়েছি। মুসলামনদিগকে ধোঁকা দেয়ার জন্য এবং তাদের গোপণ কথা জানার জন্যই তাদের সাথে মেলামেশা করি। কুরআন তাদেরকে ‘মুনাফিক্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এ পনেরটি আয়াত যারা কুরআন অমান্য করে তাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তন্মধ্যে ৬ ও ৭ আয়াতে প্রকাশ্যে যারা অস্বীকার করে তাদের কথা ও স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। আর পরবর্তী তেরটি আয়াতেই মুনাফিক্বদের সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। এতে তাদের স্বরূপ, নিদর্শন, অবস্থাও পরিণাম বর্ণনা করা হয়েছে।

এ আয়াতগুলোর বিস্তারিত আলোচনায় মনোনিবেশ করলে বোঝা যায় যে, কুরআন সূরা বাক্বরার প্রথম বিশটি আয়াতে একদিকে হিদায়াতের উৎসের সন্ধান দিয়ে বলেছে যে, এ উৎস হচ্ছে আল্লাহ্‌র কিতাব এই কুরআন; অপরদিকে বিশ্ববাসীকে এ হিদায়াত গ্রহণ করা ও না করার নিরিখে দু’টি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। যারা গ্রহণ করেছে, তাদেরকে মু’মিন-মুত্তাক্বী বলেছে, আর যারা অগ্রাহ্য করেছে তাদেরকে কাফির ও মুনাফিক্ব বলে আখ্যা দিয়েছে।

কুরআনের এ শিক্ষা থেকে একটি মৌলিক জ্ঞাতব্য বিষয় এও প্রমাণিত হয় যে, বিশ্ববাসীকে এমনভাবে দু’টি ভাগ করা যায়, যা হবে আদর্শভিত্তিক। বংশ,গোত্র,,দেশ,ভাষা ও বর্ণ এবং ভৌগোলিক বিভক্তি এমন কোন ভেদরেখা নয়, যার ভিত্ত্বিতে মানবজাতিকে বিভক্ত করা যেতে পারে।

আলোচ্য ৬ ও ৭ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ্ তা‘আলা সেসমস্ত কাফির সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, যারা তাদের কুফরীর দরুন বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতার পথ বেছে নিয়েছে। আর যারা এ বিরুদ্ধাচরণের বশীভূত তারা কোন সত্য কথা শুনতে এবং কোন সুস্পষ্ট দলীল-প্রামাণের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে প্রস্তুত ছিল না। এ সমস্ত লোকের জন্য আল্লাহ্‌র বিধান হচ্ছে যে, তাদেরকে দুনিয়াতেই একটি নগদ শাস্তিস্বরূপ তাদের অন্তঃকরণে সীল-মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে। তাদের চোখ-কান থেকে হক্ব বা সত্য গ্রহণের যোগ্যতা রহিত করে দেয়া হয়েছে। তাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে, সত্যকে উপলব্ধি করার মত বুদ্ধি, দেখবার মত দৃষ্টিশক্তি এবং শোনার মত শ্রবণশক্তি আর তাদের অবশিষ্ট নেই। আয়াতে এ সমস্ত লোকের জন্য কঠোর শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

কাফিরের সংজ্ঞাঃ كُفْر এর শাব্দিক অর্থ গোপন করা। না-শুকরী বা অকৃতজ্ঞতাকেও কুফর বলা হয়। কেননা, এতে ই’হছানকারীর ই’হছান (উপকারকারীর উপকারকে) গোপন করা হয়। শরী’আতের পরিভাষায় কুফর বলতে বোঝায় যে, সমস্ত বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা ফার্‌দ্ব/ফরয, এর যে কোনটিকে অস্বীকার করা।

যথা-ঈমানের সারকথা হচ্ছে যে, রসূলুল্ল-হ্ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্ তা‘আলা কর্তৃক প্রাপ্ত ও‘হীর মাধমে উম্মতকে যে শিক্ষাদান করেছেন এবং যেগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে সেগুলোকে আন্তরিকভাবে স্বীকার করা এবং সত্য বলে জানা। কোন ব্যক্তি যদি এ শিক্ষামালার কোন একটিকে ‘হক্ব বলে না মানে, তাহলে তাকে কাফির বলা যেতে পারে।

‘ইনযার’ শব্দের অর্থঃ ‘ইনযার’ শব্দের অর্থ হচ্ছে এমন সংবাদ দেয়া যাতে ভয়ের সঞ্চার হয়। আর ابْشَار এমন সংবাদকে বলা হয়, যা শুনে আনন্দ লাভ হয়। সাধারণ অর্থে ইনযার বলতে ভয় প্রদর্শন করা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শুধু ভয় প্রদর্শনকে ‘ইনযার’ বলা হয় না, বরং শব্দটি দ্বারা এমন ভয় প্রদর্শন বোঝায়, যা দয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। যেভাবে মা সন্তানকে আগুন,সাপ,বিচ্ছু এবং হিংস্র জীবজন্তু হতে ভয় দেখিয়ে থাকেন! ‘নাযীর’ বা ভয়-প্রদর্শনকারী ঐ সমস্ত ব্যক্তি যাঁরা অনুগ্রহ করে মানবজাতিকে যথার্থ ভয়ের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। এজন্যই নবী-রসূলগণকে বিশেষভাবে নাযীর বলা হয়। কেননা, তাঁরা দয়া ও সতর্কতার ভিত্তিতে অবিশ্যম্ভাবী বিপদ হতে ভয় প্রদর্শন করার জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। নবীগণের জন্য ‘নাযীর’ শব্দ ব্যবহার করে একদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যাঁরা তাবলীগের দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে- সাধারণ মানুষের প্রতি যথার্থ মমতা ও সমবেদনা সহকারে কথা বলা।

এ আয়াতে রসূলুল্ল-হ্ (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে যে,-

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ