আল-বাকারা ২১৬-২১৯

পৃষ্ঠা নং-১১৫

তারপর প্রণয়ন করা হলো আইন৷ পক্ষান্তরে মানুষের মনের পরিবর্তনের জন্য আমেরিকার সরকার অসংখ্য উপায় অবলম্বন করেছে৷ তাদের নিকট সবকিছুই ছিল, কিন্তু ছিল না পরকালের চিন্তা৷ অপরদিকে মুসলমানদের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় ছিল পরকালের চিন্তায় পরিপূর্ণ৷

আজও যদি সমস্যাকাতর দুনিয়ার মানুষ সে পরশমণি ব্যবহার করে দেখেন, তবে অবশ্যই দেখতে পাবেন যে, অতি সহজেই সারা বিশ্বে শান্তি-শৃংঙ্খলা ফিরে এসেছে৷

‎মদ্যপানের অপকারিতা ও উপকারিতার তুলনাঃ এ আয়াতে মদ ও জুয়া উভয় বস্তু সম্পর্কেই কুরআন বলেছে যে, এতে কিছু উপকারিতাও রয়েছে, তবে বেশ কিছু অপকারিতাও বর্তমান— কিন্তু এর উপকারিতার তুলনায় অপকারিতার মাত্রা অনেক বেশী৷ তাই একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, এর উপকারিতা এবং অপকারিতাগুলো কি কি? অতঃপর দেখতে হবে, উপকারিতার তুলনায় অপকারিতা বেশী হওয়ার কারণ কি? সবশেষে ফেকাহ্‌র কয়েকটি মূলনীতি বর্ণণা করা হবে, যেগুলো এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়।

‎প্রথমে শারাব সম্পর্কে আলোচনা করা যাকঃ এর উপকারিতার কথা বলতে গেলে-শররাব পানে আনন্দ লাভ হয়, সাময়িকভাবে শক্তিও কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে কিছুটা লাবণ্যও সৃষ্টি হয়৷ কিন্তু এ নগণ্য উপকারিতার তুলনায় এর ক্ষতির দিকটা এত বিস্তৃত ও গভীর যে, অন্য কোন বস্তুতেই সচরাচর এতটা ক্ষতি দেখা যায় না৷ শররাবের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মানুষের হজমশক্তি বিনষ্ট হয়ে যায়, খাদ্যস্পৃহা কমে যায়, চেহারা বিকৃত হয়ে পড়ে, স্নায়ু দুর্বল হয়ে আসে৷ সামগ্রিকভাবে শারীরিক সক্ষমতার উপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে৷ একজন জার্মান ডাক্তার বলেছেন,—যারা মদ্যপানে অভ্যস্ত তারা চল্লিশ বছর বয়সে ষাট বছরের বৃদ্ধের মত অকর্মণ্য হয়ে পড়ে এবং তাদের শরীরের গঠন এত হাল্কা হয়ে যায় যে, ষাট বছরের বৃদ্ধেরও তেমনটি হয় না৷ শারীরিক শক্তি ও সামর্থ্যের দিক দিয়ে অল্প বয়সে বৃদ্ধের মত বেকার হয়ে পড়ে৷ তাছাড়া শারাব লিভার এবং কিডনীকে সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে ফেলে৷ যক্ষ্মা রোগ মদ্যপানেরই একটা বিশেষ পরিণতি৷ ইউরোপের শহরাঞ্চলে যক্ষ্মার আধিক্যের কারণও অতিমাত্রায় মদ্যপান৷ সেখানকার কোন কোন ডাক্তার বলেছেন, ইউরোপে অধিক মৃত্যুর কারণই হচ্ছে যক্ষ্মা৷ যখন থেকে ইউরোপে মদপানের আধিক্য দেখা দিয়েছে, তখন থেকে সেখানে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে৷

এগুলো হচ্ছে মানবদেহে মদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া৷ বস্তুতঃ মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির উপর এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সবাই অবগত৷ সবাই জানেন যে, মানুষ যতক্ষণ নেশাগ্রস্ত থাকে, ততক্ষণ তার জ্ঞান-বুদ্ধি কোন কাজই করতে পারে না৷ কিন্তু অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানিগণের অভিমত হচ্ছে এই যে, নেশার অভ্যাস মানুষের বোধশক্তিকেও দুর্বল করে দেয়৷ যার প্রভাব চৈতন্য ফিরে পাবার পরেও ক্রিয়াশীল থাকে৷ অনেক সময় এতে মানুষ পাগলও হয়ে যায়৷ চিকিৎসাবিদগণের সবাই এতে একমত যে, শারাব কখনও শরীরের অংশে পরিণত হয় না, এতে শরীরে রক্তও সৃষ্টি হয় না; রক্তের মধ্যে একটা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় মাত্র৷ ফলে সাময়িকভাবে শক্তির সামান্য আধিক্য অনুভূত হয়৷ কিন্তু হঠাৎ রক্তের এ উত্তেজনা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷

যেসব শিরা ও ধমনীর মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত প্রবাহিত হয়ে থাকে, মদ্যপানের দরুন সেগুলো শক্ত ও কঠিন হয়ে পড়ে৷ ফলে দ্রুতগতিতে বার্ধক্য এগিয়ে আসতে থাকে৷ শারাবের দ্বারা মানুষের গলদেশ এবং শ্বাসনালীরও প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয়৷ ফলে স্বর মোটা হয়ে যায় এবং স্থায়ী কফ হয়ে থাকে, তারই ফলে শেষ পর্যন্ত যক্ষ্মা রোগের সৃষ্টি হয়৷ শারাবের প্রতিক্রিয়া উত্তরাধিকার সূত্রে সন্তানদের উপরও পড়ে৷ মদ্যপায়ীদের সন্তান দুর্বল হয় এবং অনেকে তাতে বংশহীনও হয়ে পড়ে৷

একথাও স্মরণযোগ্য যে, মদ্যপানের প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ নিজের মধ্যে চঞ্চলতা ও স্ফুর্তি এবং কিছুটা শক্তি অনুভব করে৷ ফলে তারা ডাক্তার-হাকীমদের মতামতকে পাত্তা দিতে চায় না৷ কিন্তু তাদের জানা উচিত যে, শারাব এমন একটি বিষাক্ত দ্রব্য, যার বিষক্রিয়া পর্যায়ক্রমিকভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে এবং কিছু দিনের মধ্যেই তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ পায়৷

শারাবের আর একটি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এই যে, এটা ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টির কারণ হয়ে থাকে এবং এ শত্রুতা ও বিরোধ মানুষের অপুরণীয় ক্ষতি সাধন করে৷ ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে এই অনিষ্টকারিতাই সবচাইতে গুরুতর৷ সুতরাং কুরআন সূরা মায়িদার এক আয়াতে আছেঃ

إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ

অর্থাৎ, ‘শয়তান শরাব ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে চায়৷’

শরাবের আর একটি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এই যে, মদ্যপান করে যখন মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে, তখন সে নিজের গোপন কথাও প্রকাশ করে দেয়৷ যার পরিণাম অনেক সময় অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ আকারে দেখা দেয়৷ বিষেষ করে সে ব্যক্তি যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে, তবে তার দ্বারা বেফাঁসভাবে কোন গোপন তথ্য প্রকাশিত হওয়ার ফলে সারা দেশেই পরিবর্তন ও বিপ্লব সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে৷ দেশের রাজনীতি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের কৌশলগত গোপন তথ্য শত্রুর হাতে চলে যেতে পারে৷ বিচক্ষণ গুপ্তচরেরা এ ধরনের সুযোগ গ্রহণ করে থাকে৷

শারাবের আর একটি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, সে মানুষকে পুতুলে পরিণত করে দেয়; যাকে দেখলে বাচ্চারা পর্যন্ত উপহাস করতে থাকে৷ কেননা, তার কাজ ও চাল-চলন সবই তখন অস্বভাবিক হয়ে যায়৷ শারাবের আরও একটি মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এই যে, এটি খেয়ানতের মতো৷

শরাব মানুষকে সকল মন্দ থেকে মন্দতর কাজে চালিত করে৷ ব্যভিচার ও নরহত্যার অধিকাংশই এর পরিণাম৷ আর এ জন্য অধিকাংশ শারাবখানাই ব্যভিচার, যেনা ও হত্যাকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়৷ এসব হচ্ছে মানুষের শারীরিক ক্ষতি, আর রু‘হানী ক্ষতি তো সুপরিজ্ঞাত যে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়া চলে না৷ অন্য কোন ‘ইবাদত অথবা আল্লাহ্‌র কোন যিকির করাও সম্ভব হয় না৷ সে জন্যই কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে— শারাব তোমাদিগকে আল্লাহ্‌র স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখে৷

এখন রইল আর্থিক ক্ষতির দিকটি৷ যদি কোন এলাকায় একটি শারাবখানা খোলা হয়, তবে তা সমস্ত এলাকার টাকা-পয়সা লুটে নেয়, একথা সর্বজনবিদিত৷ এ ব্যয়ের পরিমাণ ও পর্যায় বহু রকমের৷ একজন বিশিষ্ট পর্সংখ্যানবিদের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী শুধু একটি শহরে শারাবের মোট ব্যয় সামগ্রিক জীবনযাত্রার এন্যান্য সকল ব্যয়ের সমান৷

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ