আল-বাকারা ২১৬-২১৯

পৃষ্ঠা নং-১১৭

জুয়ার অবৈধতাঃ ميسر একটি ধাতু৷ এর অভিধানিক অর্থ বন্টন করা৷ ياسر বলা হয় বন্টনকারীকে৷ জাহেলিয়াত আমলে নানা রকম জুয়ার প্রচলন ছিল৷ তন্মধ্যে এক প্রকার জুয়া ছিল এই যে, উট জবাই করে তার অংশ বন্টন করতে গিয়ে জুয়ার আশ্রয় নেয়া হতো৷ কেউ একাধিক অংশ পেতো আবার কেউ বঞ্চিত হতো৷ বঞ্চিত ব্যক্তিকে উটের পূর্ণ মূল্য দিতে হতো, আর গোশত দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন হতো; নিজেরা ব্যবহার করতো না৷

এ বিশেষ ধরনের জুয়ায় যেহেতু দরিদ্রের উপকার ছিল এবং খেলোয়াড়দের দানশীলতা প্রকাশ পেত, তাই এ খেলাতে গর্ববোধ করা হতো৷ আর যারা এ খেলায় অংশগ্রহণ না করতো, তাদেরকে কৃপণ ও হতভাগ্য বলে মনে করা হতো৷ বন্টনের সাথে সম্পর্কের কারণেই এরূপ জুয়াকে ‘মাইসির’ বলা হতো৷ সমস্ত সাহাবী ও তাবে‘য়ীগণ এ ব্যাপারে একমত যে, সব রকমের জুয়াই ‘মাইসির’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত এবং ‘হারাম৷ ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে এবং জাসসাস ‘আ‘হকামুল-কুরআনে’ লিখেছেন যে, মুফাস্‌সিরে কুরআন হযরত ইবনে ‘আব্বাস, ইবনে ‘উমার, কতাদাহ্, মু‘আবিয়াহ ইবনে সালেহ, ‘আতা ও তাউস (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহুম আজমা‘য়ীন) বলেছেনঃ

‘সব রকমের জুয়াই ‘মাইসির’ এমনকি কাঠের গুটি এবং আখরোট দ্বারা বাচ্চাদের এ ধরনের খেলাও৷’ ইবনে ‘আব্বাস বলেছেনঃ من القمار المخاطرة লটারীও জুয়ারই অন্তর্ভুক্ত৷’ জাসসাস ও ইবনে- সিরীন বলেছেনঃ ‘যে কাজে লটারীর ব্যবস্থা রয়েছে, তাও মাইসির এর অন্তর্ভুক্ত৷’— (রু‘হুল-বয়ান)

مخاطرة-‘মুখাতিরা’ বলা হয় এমন লেনদেনকে, যার মাধ্যমে কেউ কেউ প্রচুর সম্পদ পেয়ে যায় এবং অনেকে কিছুই পায় না৷ আজকাল প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের লটারীর সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে৷

আজকাল নানা প্রকারের লটারী দেখা যায়৷ এসবই জুয়ার অন্তর্ভুক্ত ও ‘হারাম৷ মোটকথা, মাইসির ও ক্বিমারের সঠিক সংজ্ঞা এই যে, যে ব্যাপারে কোন মালের মালিকানায় এমন সব শর্ত আরোপিত হয়, যাতে মালিক হওয়া না হওয়া উভয় সম্ভাবনাই সমান থাকে৷ আর এরই ফলে পূর্ণ লাভ কিংবা পূর্ণ লোকসান উভয় দিকই বজায় থাকবে৷— (শামী পৃঃ ৩৫৫, ৫ম খণ্ড)

উদাহরণতঃ এতে যায়েদ অথবা ‘উমারের যে কোন একজনকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে৷ এ সবের যত প্রকার ও শ্রেণী অতীতে ছিল, বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সৃষ্টি হতে পারে, তার সবগুলোকে মাইসির, ক্বিমার এবং জুয়া বলা যেতে পারে৷ বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের শব্দ-প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থে লটারীর যতগুলো পদ্ধতি রয়েছে, এ সবই ক্বিমার ও মাইসির- এর অন্তর্ভুক্ত৷

তবে যদি শুধু একদিক থেকে পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়— যেমন, যে ব্যক্তি অমুক কাজ করবে, তাকে পুরস্কার দেয়া হবে৷ আর এতে যদি কোন চাঁদা নেয়া না হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই৷ কেননা, এটা লাভ ও লোকসানের মাঝে পরিক্রমণশীল নয়, বরং লাভ হওয়া ও লাভ না হওয়ার মধ্যেই সীমিত৷

এ জন্য স‘হীহ ‘হাদীসে দাবা ও ছক্কা-পাঞ্জা জাতীয় খেলাকেও ‘হারাম বলা হয়েছে৷ কেননা, এসবেও অনেক ক্ষেত্রেই টাকা-পয়সার বাজি ধরা হয়ে থাকে৷ তাস খেলায় যদি টাকা-পয়সার হার-জিত শর্ত থাকে , তবে তাও ‘হারাম৷

মুসলিম শরীফে বারীদা (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলে-আকরাম (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ছক্কা-পাঞ্জা খেলে সে যেন শূকরের গোশত ও রক্তে স্বীয় হস্ত রঞ্জিত করে৷ হযরত ‘আলী (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু) বলেছেন, ছক্কা-পাঞ্জাও জুয়ার অন্তর্ভুক্ত৷ হযরত ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু) বলেছেন যে,— দাবা ছক্কা-পাঞ্জা খেলা অপেক্ষাও খারাপ৷—(ইবনে-কাসীর)

ইসলামের প্রাথমিক যুগে শারাবের ন্যায় জুয়াও ‘হালাল ছিল৷ মক্কায় যখন সূরা রূমের غُلِبَتِ الرُّومُ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং কুরআন ঘোষণা করে যে, এখন রোম যদিও তাদের প্রতিপক্ষ কিসরার কাছে পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তারা কয়েক বছরের মধ্যেই জয়লাভ করবে৷ তখন মক্কার মুশরিকরা তা অবিশ্বাস করে৷ সে সময় হযরত আবু বাক্‌র (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু) মুশরিকদের সাথে বাজি ধরলেন যে, যদি কয়েক বছরের মধ্যে রোমবাসীরা জয়লাভ করে, তবে তোমাদেরকে এ পরিমাণ মাল পরিশোধ করতে হবে৷ এ বাজি মুশরিকরা গ্রহণ করল৷ ঠিক কয়েক বছরের মধ্যে রোমবাসীরা জয়লাভ করল৷ শর্তানুযায়ী হযরত আবূ বাক্‌র (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু) তাদের নিকট থেকে মাল আদায় করে রসূল (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হলেন৷ হুযুর (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘটনা শুনে খুশী হলেন, কিন্তু মালগুলো সদাকা করে দিতে আদেশ দিলেন৷

কেননা, যে বস্তু আগত দিনে ‘হারাম হবে, আল্লাহ তা‘আলা সেগুলো ‘হালাল থাকাকালেও স্বীয় রসূল (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে তা থেকে রক্ষা করেছেন৷ এ জন্যই তিনি শারাব ও জুয়া থেকে সর্বদা বেঁচে রয়েছেন এবং কিছুসংখ্যক বিশিষ্ট সাহাবীও তা থেকে সর্বদা নিরাপদে রয়েছেন৷ এক রিওয়ায়াতে আছে যে, হযরত জিবরাঈল (‘আলাইহিচ্ছালাম) রসূল (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সংবাদ দিয়েছিলেন যে, হযরত জা’ফার (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-এর চারটি অভ্যাস আল্লাহ্‌র নিকট অতি প্রিয়৷ হুযুর (সল্লাল্ল-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জা’ফার (রদ্বিয়াল্ল-হু ‘আনহু)-কে জিজ্ঞেস করলেন,— তোমার চারটি অভ্যাস কি কি? তিনি উত্তর দিলেন, আজ পর্যন্ত আমার এ চারটি অভ্যাস কাউকেই বলিনি৷ আল্লাহ যখন আপনাকে জানিয়েই দিলেন তখন বলতে হয়৷ তা হচ্ছে এই, আমি দেখেছি যে, শারাব মানুষের বুদ্ধি বিলুপ্ত করে দেয়, তাই আমি কোন দিনও শারাব পান করিনি৷ মূর্তির মধ্যে মানুষের ভাল-মন্দ কোনটাই করার ক্ষমতা নেই বলে জাহেলিয়াত আমলেও আমি কোন দিন মূর্তিপুজা করিনি৷ আমার স্ত্রী ও মেয়েদের ব্যাপারে আমার মধ্যে সম্ভ্রমবোধ অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে, তাই আমি কোন দিনও যেনা করিনি৷ আমি দেখেছি যে, মিথ্যা বলা অত্যন্ত মন্দ কাজ, তাই আমি কোন দিনও মিথ্যা কথা বলিনি৷—(রুহুল-বয়ান)

জুয়ার সামাজিক ও সামগ্রিক ক্ষতিঃ জুয়া সম্পর্কে কুরআন মাজীদ শারাব বিষয়ে প্রদত্ত আদেশেরই অনুরূপ বিধান প্রদান করেছে যে, এতে কিছুটা উপকারও রয়েছে, কিন্তু ক্ষতি অনেক বেশী৷ এর লাভ সম্পর্কে সকলেই অবগত আছেন৷ যদি খেলায় জয়লাভ করে, তবে একজন দরিদ্র লোক একদিনেই ধনী হয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু এর আর্থিক, সামাজিক এবং আত্মিক ক্ষতি সম্পর্কে অনেক কম লোকই অবগত৷ এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে দেয়া হচ্ছে৷ জুয়া খেলা একজনের লাভ এবং-

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
সব বিভাগ